কালা মন ধলা পাথর সহ্য করবে কেমনে? আহারে, সেদিনও দেখে এলাম—কী সুন্দর, কী অপূর্ব তার বিস্তৃতি! অথচ কতগুলো পাথরখেকোর লোভে বিরাণ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে ভোলাগঞ্জেরসাদাপাথর আর জাফলং-এর মোনালি প্রান্তর। চোখে থাকে সুধা আর মনে থাকে রুচি, কিন্তু বাঙালিরচোখেমুখে শুধু ক্ষুধা আর লোভ দেখি! সুযোগের অভাবে যারা সৎ ছিল, তারা এই সুযোগে ভোলাগঞ্জেরসাদাপাথর বিক্রি করে দিয়েছে! এখন ভোলাগঞ্জ চিতার মতোছাইভষ্মে ভরে আছে।
বারবার প্রমাণ করছে—জাতি হিসেবে বাঙালি চোর, ধুরন্ধর। তাছাড়া বাস্তবিক গরিব এবং মানসিকভাবেঅপরাধপ্রবণ। পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ ভোলাগঞ্জে এখন আর মানুষের দেখার কিছু নাই! পাথরখেকোরা যে শ্রমিকদের দিয়ে ওখান থেকে পাথর তুলেছে, তারাই ঝালমুড়ি বিক্রি করে, ডাব-শসা বেচে কিংবা নৌকা-ট্রলার চালিয়ে জীবিকার অন্বেষণ করতো। নিজেদের পায়ে নিজেরা কুঠার মারে যে জাতি, তারা আসলে ভাগ্যের সাথেই মকারি করে।
যে জাতি যা ধারণের যোগ্য নয়, খোদা সে জাতিকে তা দেন না! প্রথমবার (২০১৫ সালে) যখন জাফলং গেলাম, তখন জাফলং-এর বাংলাদেশ সীমানার ওপারেই ভারতের মেঘালয় দেখে খুব আফসোস হয়েছিল—এতো সুন্দর দেখতে যে জায়গার শ্রী, সেটাকে বিধাতা বাংলাদেশকে না দিয়ে কেন ভারতের অংশ করলেন! মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তারপর কারা যেন বলেছিল, আসাম-করিমগঞ্জ বাংলাদেশের, ভারত হঠকারিতা করে তা দখলে রেখেছে! আশান্বিত হয়েছিলাম—কোনো একদিন ভিসা ছাড়াই সেখানে যেতে পারবো, আমাদের ভূমি হবে! অথচ এখন মনে হচ্ছে, মেঘালয়ের সৌন্দর্য দেখার ভাগ্য এই জাতির নসীবে কেন জোটেনি! চোরদের কপালে আসলে ভালো কিছু থাকা উচিত নয়!
শেষবার (২০২৩ সালে) যখন ভোলাগঞ্জেরসাদাপাথরে গেলাম, মনটাই জুড়িয়ে গেল। কী সুন্দর! সহকর্মীদের সঙ্গে ঘণ্টা দুয়েক গোসল করলাম, সহস্র-অজস্র পাথর ছুঁয়ে দেখলাম। ভোলাগঞ্জের ওপারের ভারতের অংশের চেয়ে আমার দেশের সাদাপাথর অংশ হাজারগুণ সুন্দর মনে হয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে সিলেটকে দেশের সৌন্দর্য নগরীর খেতাব দেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল রাতারগুল এবং ভোলাগঞ্জ। অথচ হায়েনার দৃষ্টিতে, সৌন্দর্য-হন্তারকজমদের থাবায় ভোলাগঞ্জের চিত্রই বদলে গেছে—এখন যেন পুরোটাইধ্বংসস্তূপ। লুটেরারাথেমে নেই, খুবলে-খুঁড়ে শেষ করে দিচ্ছে সবকিছু। অথচ সেখানেও প্রশাসন ও পুলিশ আছে! দেশের চলমান আইন-কানুন ওখানের জন্যও প্রযোজ্য! অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আফসোস করে বলছেন—চোখের সামনে জাফলং-ভোলাগঞ্জধ্বংস হয়ে গেল, কিছুই করতে পারলাম না!
বাংলাদেশ বৈশ্বিক পর্যটনের বৃহত্তর কেন্দ্র হতে পারতো, অথচ ধীরে ধীরে সব আশা শেষ হয়ে যাচ্ছে! কক্সবাজার এবং কুয়াকাটা সিন্ডিকেটের আস্তানা, পাহাড়ে অজানা ঝুঁকি, সেন্টমার্টিন রহস্যে ঘেরা—বাকি ছিল সিলেট! ক্ষুধার্ত হায়েনারউৎপাত এবং মানুষদের চুপ থাকায় আশার কফিনে শেষ পেরেক বিঁধলো। জাফলং ও ভোলাগঞ্জের পাথর সারাদেশে বিক্রি হবে! আমরাই কিনবো এবং সুরম্য অট্টালিকা গড়বো—যেখানে থাকবে দূষিত অক্সিজেন, অশান্তি এবং হর্নের বিষাদ! রুচি মেরে রুজি করা এক পতিত জাতির ইতিহাসে আমি-তুমিও থাকবো অংশীদার। সুযোগ পাইনি বলে আমাদের দু’জনের (লেখক + পাঠক) চোর হওয়া বাকি!
ঠক ও প্রতারক জাতির ইতিহাসে তাদের জীববৈচিত্র্য নিয়ে কোনো ভাবনা নাই, নাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মঙ্গলময় কোনো পরিকল্পনা। এরা শুধু নিজেরাই ভোগ করে গেছে অন্যায় ও অবৈধভাবে। নয়তভোলাগঞ্জেরসাদাপাথরে কেউ এমন নগ্ন হস্তক্ষেপ করে? সুন্দরকেধ্বংস করা যদি কোনো এক জাতির বৈশিষ্ট্য হয়, তবে তাদের এখানে, এই এখানেই পাবেন—যারা খাদ্যে বিষ মিশিয়ে নিজেরা খায়, সম্পদ চুরি করে ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা করে এবং সৌন্দর্য নিজের হাতে ধ্বংস করে। এ জাতির দ্বারা সরকারি তথা জাতীয় সম্পদ ধ্বংসেরকিচ্ছাওদু’লাইনে শেষ করা যাবে না। বাঙালি আসলেই আত্মঘাতী। সুন্দর সাদাপাথরেরজানাজায় কে ইমামতি করেছে, তা একদিন জানা যাবে—আমরা সেই খবরের অপেক্ষায়! তবে দায়ীদের শাস্তির অপেক্ষা করি না—আশাহীন!
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com








