আমার ঢাকা মেডিকেলের এক নার্সের সাথে সম্পর্ক ছিলো। নাম অমিতা বিশ্বাস, আমি তাকে অমি বলে ডাকতাম। বয়সে আমার থেকে দুই বছরের বড় আর নাম শুনেই ধর্ম বুঝে ফেলার কথা। হুম, হিন্দুধর্মালম্বী ছিলো।
আমার দাদার ব্রেনস্টোকের চিকিৎসা করাতে ২০১৩ সালের দিকে ঢাকা মেডিকেলে যাই। ওখানেই অমির সাথে আমার পরিচয়। আমিই আগ বাড়িয়ে পরিচিত হতে যাই, মেয়েটার হাইট খুব বেশি ছিলো না, ৫ ফুট ১ এর মত। আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে পুতুল পুতুল লাগতো। শুরুটা হলো বন্ধুত্ব দিয়ে।
অমির সাথে আমার ফোনে প্রচুর কথা হতো, ক্যাম্পাসে গেলেই ও নার্সেস হোস্টেল থেকে টিএসসি চলে আসতো। শুরুতে একটু ইতস্ততা করতাম, পরে ভালোই লাগতো ওকে নিয়ে ক্যাম্পাসময় ঘুরে বেড়াতে। অমির এক্স ছিলো, আমাকে বেশ পরে জানিয়েছে ব্যাপারটা। সেদিন সংসদের সামনে বসে আমাকে তার এক্সের গল্প বলছিলো-
হিন্দু ছেলেদের নাকি মেয়ে পক্ষের কাছে অনেক ডিমান্ড। অমির এক্সের নাম মধু।।
মধু বিয়ে করে ফেলেছে, অমির সাথে ৭ বছরের সম্পর্ক ছিলো। অমি যখন খুলনা এক আত্নীয়ের বাসায় থেকে নার্সিং এ ভর্তি হয়, সেখানে কোয়ার্টারের আরেক বাসায় এই মধুরা থাকতো, ওখানেই পরিচয়। এই ৭ বছরে অজস্রবার তারা শারীরিক ভাবে মিলিত হয়েছে। শুনে আমার কান গরম হয়ে যাচ্ছিলো, এসব যখন শুনছি তখনো অমি আমার বন্ধুর মত, প্রেমের সম্পর্কে না আমরা। মধু ছেলেটা ঢাকাতেই থাকে, এখন আর যোগাযোগ হয় না। সম্পর্ক ভেঙে যাবার কারণ মধুর পরিবার অমিকে মেনে নিবে না, এই অযুহাতে সে বিয়ে করেছে অন্য মেয়েকে।
অমির এইসব ঘটনা অনায়াসে বলে ফেলা, প্রমাণ করতো- বেচারী অনেক দিন চাপা কষ্টে আছে, কাউকে কিছু জানাতে পারেনি, আমাকে পেয়ে কথার তুবড়ি ছড়াচ্ছে।
অমির এক ভাই কলকাতার ডানলপ থাকে। অমির দাদাবাড়ি খুলনা। ওখানে ওর বাবা- মা থাকে। আর ও ঢাকায় একা। আস্তে আস্তে ওর কাছে ওদের অনেক গল্প শুনি, একসময় আর শুনতে মন চায় না।। অমি যেহেতু জব করতো, অই টাকা পয়সা খরচ বেশি করতো, আমি করতে গেলে কইতো আমি তোমার বড় না বয়সে? বলেই ফিক করে হেসে দিতো।
এভাবেই চলতে চলতে একদিন আমরা দু’জন দু’জনের প্রতি দূর্বল হয়ে যাই। এমনকি স্পেশাল ম্যারেজ এক্টের মাধ্যমে বিয়েও করার সিদ্ধান্ত নেই। ভালোই চলছিলো, অমিও আমার উপর খুব খুশি ছিলো। আমাকে বলতো, তোমার কেয়ারিং আর আচরণে মনেই হয় না, তুমি আমার ছোট।
একদিন ভোর সকালে আম্মু ডেকে তুললো আমাকে, বললো দেখ নিচে কোন মেয়ে দাঁড়াই আছে তোর জন্যে। আমি চোখ কচলে উঠে তব্দা খেয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। পরে নিজের ফোন হাতে নিয়ে দেখি সকাল ৬ টাও বাজে নাই, আর অনেকগুলা মিসড কল। ফোন রাতে সাইলেন্ট করে ঘুমাতাম। অমি এত সকালে কেন কল দিলো, বিছানা ছেড়ে উঠে দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দেখি নিচে অমি দাঁড়ানো। আমি বা আমার পরিবার এইরকম ঘটনার সাথে পরিচিত না, আম্মুর চোখে মুখে রাগ-উৎকন্ঠা, সব এড়িয়ে ৫ মিনিটে আমি নিচে নামলাম।
অমি আমাকে নামার সাথে সাথে টেনে বাসার সামনে থেকে নিয়ে, রিক্সায় উঠলো ঢাকা মেডিকেল যাওয়ার জন্যে।
আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না, আমি প্রশ্ন করলাম শুধু বললো চুপ। আম্মু আমাকে কল দিচ্ছে, আমি ফোন আবার সাইলেন্ট করে পকেটে ঢুকিয়ে দিলাম।
ঢাকা মেডিকেলের ৪ তালায় আইসিইউ-এর সামনে আমি দাঁড়ানো, অমি ভিতরে আছে। আমি এখনো জানি না কি হয়েছে। অমির হেয়ালি স্বভাবের সাথে আমি ১ বছরের মত পরিচিত তাই নিজের উপর এতো বেশি প্রেশার না দিয়ে বাইরে ঠান্ডা মাথায় অপেক্ষায় আছি। অমি বাইরে এসে বললো, শোভন মধু মারা গেছে। আমি শুনতে চাইলাম বিস্তারিত-
গতকাল রাতে জগন্নাথ হলের সামনে দুই বাইকের সংঘর্ষে মধু প্রচন্ড আহত হয়। অন্য বাইকে কাপল ছিলো, উনাদের তেমন কিছু হয়নি। মধুকে রাতেই মেডিকেলে ভর্তি করানো হয়। ধীরে ধীরে অবস্থার অবনতি হয়ে আজ সকাল ৪ টার পর মধু মারা যায়।
আই সি ইউ এর বাইরে মধুর কিছু আত্নীয় স্বজন হালকা বিলাপ করছে, এতক্ষণে খেয়াল হলো। আমাদের দুজনের দিকে লম্বা মতন একজন এগিয়ে এসে অমিকে বললো, তুমি জানলা কিভাবে?
অমি বললো, রতি দিদি জানাইছে আমাকে ১২ টার দিকে, তারপর থেকে আমি এখানে। মারা যাবার পর মগবাজার গেছিলাম আবার এলাম।
লোকটা এটুকু শুনে কইলো- ওর বউ আসতেছে কাছাকাছি আছে, তুমি কি চলে যাবা?
অমি বললো- রঞ্জন দা আপনার জানা উচিত আমি এখানে জব করি, আমি যে কোন কারণেই এখানে দাঁড়াতে পারি।
লোকটা সরে গেলো অন্যদিকে।
এই রঞ্জন মধুর বন্ধু। মধুকে অমির পরিচিত ঢাকা মেডিকেলের অনেকেই চিনতো। রতি দিদির আইসিইউ-তে ডিউটি ছিলো, সেও মধুকে চিনতো, উনিই অমিকে কল করে জানায়। মধু মারা যাবার পর থেকে অমি আমাকে কল দিয়ে না পেয়ে বাসার নিচে এসে কলিং চেপে আম্মুকে বলে আমাকে ডাক দিয়ে উঠিয়ে দিতে।
মধুর বউ নাকি ৫ মাসের গর্ভবতী। অমি মধুর বউকে দেখে নাই কখনো। এক গভীর আগ্রহ অমির চোখে, আমারো আগ্রহ হচ্ছে মিথ্যা বলবো না। নতুন একটা জটলা এলে এখানেই মধুর বউ, আইসিইউ এর ভিতরে যাচ্ছে, অমি দ্রুত আমাকে টেনে ভিতরে নিয়ে গেলো। আমি বুঝতে পারছি, মধুর লাশ দেখে বউ কেমন করে এই দৃশ্য অমি নিজ চোখে দেখতে চায়।
মধুর বউ কাছে গেলো, হাউমাউ করে কাঁদলো, কিন্তু লাশের খুব কাছে গেলো না।। সবাই ধরাধরি করে আইসিইউ থেকে বের করে নিয়ে আসলো উনাকে।
আমি আর অমি সাইডে আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখলাম। সবাই বের হয়ে গেলে অমি মধুর লাশের বিছানার পাশে দাঁড়ায়। আমাকে অবাক করে দিয়ে লাশের কপালে চুমু খায়, অথচ মধুর মুখে ফেনা বেরোচ্ছিলো, মুছে দিলেও আবার বের হয়। দুই হাত দিয়ে মধুর বুক হাতিয়ে মাথার অল্প চুল গুলো হাতাতে থাকে। আমি তখন অমিকে ভালোবাসি, কদিন পর আমরা হয়তো বিয়ে করবো, অথচ এই দৃশ্য দেখে আমার খারাপ লাগছে না- অবাক লাগছে। অমি বললো চলো বাইরে যাই। এরমধ্যে অমিকে আমি একবারো কাঁদতে দেখি নাই।।
মধুর চেহারা ভালো না, মানে মারা গেছে সেজন্যে না, মুখের কার্টিন গায়ের রঙ হাইট কিছুই তেমন ভালো ছিলো না। অমির মিস্টি সুন্দর চেহারার সাথে মধুব্যাটা বড্ড বেমানান ছিলো।
অমির এক আত্নীয়ের বাসা মালিবাগ। আমাকে বললো আজ হোস্টেলে যাবো না, মালিবাগ যাবো। আমিও বললাম চলো-
……
অমি সম্ভবত এখন কলকাতায় থাকে। মধু মারা যাবার পর সে সরকারী চাকরি ছেড়ে দেয়। আমার সাথে যোগাযোগ রাখে না হঠাৎ করেই। আমি ওকে খুব খুঁজে বেড়াই পাই না।। আমি ওর গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় খুলনা তেরখাদা যাই কিন্তু লাভ হয় না, ওরা সবাই তখন কলকাতায়।
অমি মধুকে ভালোবাসতো, আর আমাকে অবলম্বন হিসেবে বাঁচতে চেয়েছিলো। আমাকে দেখানো ভালোবাসায় কমতি ছিলো না, কিংবা মধুর সাথে তুলনা করেও ভালোবাসতো না। মধু বেঁচে থাকলে অমি হয়তো ভালো থাকতো, মধু নেই অমি নিজেকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। আজো কোন খোঁজ পাইনি। মেনে নিছি, বুঝে গেছি, ভালোবাসাদের অমিদের দেখে ভালোবাসা শেখা উচিত।








