জীবন নিয়ে সবচেয়ে গভীর আফসোস হবে তাদের, যারা সময়ের প্রতি অবিচার করে। বাবা খেতখামারে ঘাম ঝরান, কেউ বা বিদেশ-বিভুঁইয়ে গাধার খাটুনি খেটে পাঠান কষ্টার্জিত টাকা। তাদের বিশ্বাস—“আর ক’টা দিন কষ্ট, তারপর সুখ আসবেই।” স্বপ্ন দেখেন, সন্তান পড়াশোনা শেষ করে একদিন গল্প বলার, গর্ব করার উপলক্ষ্য এনে দেবে, ঘর ভরে উঠবে হাসিতে। বেকারত্বঘুচে যাবে, আনন্দে ঘর আলোয় ভরে উঠবে। সব ত্যাগ, পরিশ্রম, উৎসর্গ— শুধুই সন্তানের জন্য।
অথচ সেই সন্তান পড়ার টেবিলে নেই। রাত জেগে আড্ডা মারে, বড়ো ভাইদের পাখনা চাটে, মোবাইলের পর্দায় বন্দি হয়ে সময় গোনে। বাবা-মায়ের রক্ত-ঘামের টাকার কোনো মর্যাদা নেই তার কাছে। বই কেনার কথা বলে, প্রাইভেটের অজুহাতে যে টাকা আনে, তা উড়ে যায় পাট্টি, উল্লাস আর সিগারেটের ধোঁয়ায়। সারাবছরবইয়ের পাতায় ধুলো জমে, ক্যাম্পাসেনেতামি আর আড্ডায় বাঁদরামি। বন্ধুমহলে নাম উঠেছে ‘প্রেমিক পুরুষ’ হিসেবে— বাবার রক্ত বিক্রি করা টাকায় যার বিলাসিতা মেটে!
ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নে তোমাকে দূর শহরে রেখে বাবা-মা স্বপ্ন আঁকেন। সন্তান পরিশ্রম করছে ভেবে তারাও ভালো-মন্দ রান্না-খাওয়া বন্ধ রাখেন। অথচ সন্তান সবকিছু বাদ দিয়ে ঘুরছে। সে পাঠে নেই বরং মাঠের আড্ডায় সময় কাটায়। রাত জেগে নাটক-সিনেমাতে মজে থাকে। জীবনের এই তিন-চার মাসের পরীক্ষাতেও হেরে গিয়ে বাবা-মায়ের সামনে কোন মুখে দাঁড়াবে? যারা তোমার উন্নতির জন্য দিনরাতহয়রান হচ্ছেন তাদের স্বপ্ন ঘিরে তোমার ভাবনা না থাকাটা ব্যর্থতা। রাজপথের স্বপ্ন ভেঙো না। ভালো বিশ্ববদ্যালয়েভর্তির সুযোগ পাওয়া মানে সুন্দর আগামী- ভুলে ভুল পথে পা বাড়িও না। সময় কাজে লাগাও।
এ এক দিকের চিত্রের বর্ণনা। এখন দেখি ছবির অন্য দিক। ছা-পোষা পরিবারের কোনো ছেলে-মেয়ে শহরে আসে দু’চোখে স্বপ্ন নিয়ে। পরিবারে অর্থ নেই, তবু ইচ্ছা আছে উঁচু হয়ে দাঁড়াবার। তারা শপিংমল, সুপারশপ বা রেস্টুরেন্টে পেটে ভাতে কাজ করে। আট-দশ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে হাসিমুখে সামলায় বসের বকুনি, ক্রেতার রূঢ়তা। মাস শেষে মেসভাড়া, টিউশনফি, নিত্য চাপ— সব মিলিয়ে চোখে নামে অন্ধকার।
এই ছেলেমেয়েরা পড়তে চায়, কিন্তু সামর্থ্য নেই। ক্লাসের সময় যায় ডিউটিতে, পরীক্ষার সময় ছুটি চাইলেবসেরা চোখ পাকায়, যেন পড়াশোনা অপরাধ। কোনোমতে পাশ করে যায়, কিন্তু জ্ঞানের গভীরতায় পিছিয়ে পড়ে। আগে পার্ট-টাইম কর্মী ছিল, পরে ফুল-টাইম চাকরিজীবী হয়— কোম্পানি বদলায়, কিন্তু ভাগ্য বদলায় না। অথচ যাদের পড়ার নিরবচ্ছিন্ন সুযোগ ছিল, যাদের বাবা-মা নিজেদের রক্ত-ঘাম মিশিয়ে ভবিষ্যৎ সাজিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, তাদের অনেকেই সে সুযোগ নষ্ট করে।
যারা চেষ্টা করে তাদের সামনে পথ উন্মোচিত হয়। শত সমস্যা মধ্য থেকে সমাধানের রাস্তা পরিস্কার হয়। বড় হওয়া ইচ্ছা থাকতে হবে এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। একটা জীবন কেবল বাবার পরিচয়ে কিংবা বংশের নাম বিক্রি করে চলা যাবে না। নিজের পরিচয়ের দরকার হবে। আত্মপরিচয়ের মাধ্যমেই আত্মসম্মান নির্ধারিত হয়। কারো চোখ রাঙানি সহ্য করে, কেবল কৈফিয়ত দিয়ে বাঁচাটাকেসম্মানজনক মনে হয়? নিজেকে পরিণত করার চেষ্টায় মনোনিবেশ করতে হবে। সময়ের কাজ সময়ে শেষ না করলে সে দায়ভার যার যার। অনেক ক্ষেত্রেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ জীবন দুইবার দেয় না।
শিক্ষার্থী মানেই পড়াশোনা— এ এক সময়ের সত্য এখন ধোঁয়াশা হয়ে গেছে। চোখের সামনে দেখি, অনেকেই নিজের ভবিষ্যৎকে নিজের হাতে গলা টিপে মেরে ফেলছে। অনার্স-মাস্টার্সে পড়ে অথচ কোর্সের নামও জানে না। পঠিত বিষয়ের ভিত্তি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। রাষ্ট্রীয় নিয়মের ফাঁকফোকর পেরিয়ে সার্টিফিকেট হয়ত জোটে, কিন্তু তাতে মুক্তি আসে না— জীবনের বাস্তবতায় তা গলার কাঁটা হয়েই রয়ে যায়।
অবশেষে দেখা যায়, নাইরেতাইরে করে বিএ-মাস্টার্স পাস হয়ে গেছে। এখন না পায় চাকরি, না পারে মজুর হতে! কারণ, শিক্ষা সেখানে মুখস্থ করা নাম, নয় আত্মস্থ করা জ্ঞান। যোগ্যতার জায়গা ছেড়ে দিয়ে তারা সার্টিফিকেটের সিন্দুকে বন্দি থাকে, যেখানে স্বপ্নও নিঃশ্বাস নিতে পারে না।
যারা সুযোগ পেয়েছ, তোমাদের বলি— পড়ো। সময়ের প্রতি সুবিচার করো। কারণ সময়ের প্রতিশোধ বড়ো নির্মম। নিজের দক্ষতা আর যোগ্যতাই তোমার আসল পরিচয়। তোমার পরিশ্রমই তোমার ঠিকানা নির্ধারণ করবে। চাকরির বাজারে তুমি চৌধুরি সাহেবের ছেলে না খানবাড়ির বংশধর— তাতে কিছুই যায় আসে না। পরিচয় ঠিক করবে যোগ্যতায়।
গন্তব্য নির্ধারিত হবে তোমার যোগ্যতার মাপকাঠিতে। যদি আজ অলসতা করো, তবে একদিন দাসের ছেলেকে মনিব মানতে হবে। স্যার ডেকে মাথা নত করতে হতে পারে কোনো মেথরের ছেলেকেও। কারণ জ্ঞানের রাজ্যে জন্ম নয়, যোগ্যতাই একমাত্র মানদণ্ড।
সময় থেমে থাকে না। যারা অবহেলা করে, তাদের ধ্বংস ডেকে আনে সময় নিজেই। তাই পড়ো, জানো, প্রস্তুত হও। নিজের জীবনকে নিজের হাতে গড়ে তোলো। সময় যেন তোমার হাতে অবহেলিত না হয়— এই হোক তোমার প্রতিজ্ঞা।
আর হ্যাঁ— এই লেখার শেষ পর্যন্ত পড়লে তুমি হয়ত কিছুটা সময় নষ্ট করলে বটে, কিন্তু যদি একটু ভাবো, তবে এটাই হবে তোমার জীবনের সঠিক সময়ের শুরু।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com








