দাম্পত্য মানে কী? অমিলে অমিলেমিলেমিশে থাকা। বিয়ের দশটা বছর বাদে আপনি বউয়ের স্বভাবের হয়ে যাবেন কিংবা বউ আপনার স্বভাবের হয়ে যাবে। দুইটা মানুষ যতই আলাদা বৈশিষ্ট্যের থাকুক তা স্বামী-স্ত্রীতে পরিণত হওয়ার পর বেশিদিনটিকবে না। যতই জেদ ধরে একরোখা চলতে চান, একসাথে থাকতে হলে এই বাহাদুরি বেশিদিন থাকবে না। ঋণ করা কিংবা বিলীন হওয়া- একপর্যায়েএকপথে একসাথে হাঁটতেই হবে। এক স্বভাবের, একই চিন্তায় বদলে যাওয়া মানেই দাম্পত্য। সেখানে ভালোর ওপরে মন্দ কিংবা মন্দের ওপরে ভালো- কোনটা কার ওপরে রাজ বা কাজ করবে তা বলা যাচ্ছে না তবে আলামতে কিছুটা অনুমান করা যায়।
যে-কোনো ভাবে যদি বিয়ের পনেরো বছর পরেও দু’জনের আলাদা আলাদাস্বাতন্ত্র্যবোধ থাকে তবে বুঝতে হবে এই সমীরণ- কেউ কারো না হওয়ার পানেই ছুটিয়েছে। যৌথজীবনের সমীকরণে কোথাও ত্রুটি না থাকায় ভাগ্যও ভ্রূকুটি কেটেছে। সমস্যা সমাধানের পথেও হাঁটেনি। কে কাকে দখল বা জয় করবে সেটা ভিন্ন প্রশ্ন তবে দুজনের চিন্তা, স্বভাব কিংবা চেষ্টা ও যোগ একই গন্তব্যের দিকে না হাঁটলে শুধুই ধাক্কায় ধাক্কায় থমকে যেতে হবে।
যাত্রার শুরুতে আপনি খুব ভালো অবস্থান থেকে কিংবা নিন্দিত আশ্রম থেকে আরম্ভ করতে পারেন কিন্তু বিশ্রাম হবে যৌথভাবে। সেখানে একজনের স্বভাব থেকে আরেকজনকে আলাদা করা সম্ভব হবে না। হয়ত দু’জনেই সমাজ সংসারের জন্য উপকারী হবে কিংবা ষড়যন্ত্রী হবে- ভিন্ন ভিন্ন কিছুই না। সঙ্গী অথচ আলাদা আলাদা রঙ- দেখতেও বিদঘুটে লাগে। সংসারের বিতর্ক বিবাদে পরিণত হলে শান্তি পালায়। সেজন্যই যুক্তির খাতিরেকুযুক্তি বা অযুক্তিও মেনে নিতে হয়। অভিযোগ করার চেয়ে অভিযুক্ত হওয়া ভালো যদি অভিনয় শান্তি দেয়!
একসময় আবিষ্কার করবেন, আপনি আরেকজনেরমতো করে কথা বলেন, চিন্তা করেন কিংবা আচরণ-ব্যবহার করেন। আপনার স্বভাবের মধ্যে আরেকজনের স্বভাব প্রবলভাবে ছায়া ফেলেছে। সেই মানুষটিঅন্যকেউ নয়- বউ/স্বামী। শুধু সঙ্গীই নয় বরং আপনি যে পরিবেশে বেশিরভাগ সময় কাটাবেন, যাদের সাথে বেশি মিশবেন এবং যে সমাজে হাঁটবেন সেই অঙ্গনের ছায়া আপনার মধ্যে পড়বেই। আপনি শিখতে না চাইলেও পরিবেশের প্রভাব অস্বীকার বা উপেক্ষা করতে পারবেন না। সঙ্গীই তো জঙ্গির উত্থান ঘটায়! একসময় দেখবে আপনার কথা ঢঙ, আচরণের রঙ এবং চরিত্রের সঙ-ও বদলে যাচ্ছে। আরেকজনেরমতো হয়ে যাচ্ছেন কিংবা আরেকজন আপনার মতো হয়ে যাচ্ছে- কী বিচিত্র!
প্রভাবিত হওয়া বা প্রভাবিত করার ক্ষেত্রটা ব্যক্তির চারিত্রিক দৃঢ়তা, নৈতিক সততা ও বিশ্বাসের ক্ষমতা দ্বারা নিরূপিত হয়। চূড়ান্তসামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে বিবাহের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। দু’জন মানুষ সম্পূর্ণভাবে আলাদা সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে দাম্পত্যে বদ্ধ হওয়ার অল্পকাল পরেই যে-কোনো একটা সংস্কৃতিকে হারিয়ে ফেলে। ভাষার টানেও ঐক্য চলে আসে। সঙ্গদোষে লোহা ভাসে কিংবা সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস এবং অসৎ সঙ্গে সঙ্গে সর্বনাশ- এই প্রবাদ-প্রবচনগুলো অপরীক্ষিতভাবে উদয় হয়নি। মানুষ আসলে প্রভাবশালীরপ্রভাবাধীন। সে মানতে কিংবা মানাতে ভালোভাবে।
সেজন্য ভালো মানুষের সঙ্গ দরকার। সৎ সঙ্গীর সঙ্গ জীবনকে রাঙিয়ে তোলে। বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী পাওয়া মানে মানবজীবন শান্তির আবরণে নিশ্চিন্ত হওয়ার নিশ্চয়তা। যেখানে শঙ্কা থাকে অশান্তির, চাপ থাকে নষ্ট-ভ্রষ্ট হওয়ার এবং পরিবেশ থাকে লোভে পড়ার সেখানে অশান্তি অবশ্যম্ভাবী। একলা মানুষের চেয়ে দাম্পত্যের শক্তি মানুষের বিচরণ বা উপস্থিতিকে আরও রঙিন করে তোলে।
মানুষের মধ্যে বদলে দেওয়ার ক্ষমতার চেয়ে বদলে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। সেজন্য উত্তম জীবনসঙ্গীইহকালের আশীর্বাদ। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভাবতে হবে। চিন্তা ও কাজে বিশ্বস্ত থাকলে এবং সৎ উদ্দেশ্য পোষণ করলে জীবন সহজ ও সুন্দ হয়। ভালোর দ্বারা সবকিছুফিল্টারিং হলে সে জীবন সহজ হয়। জীবনসঙ্গী জীবনের উপমা ও আনন্দের আভরণ হোক। বদলের রদবদল হোক উত্তমের আলোয়। কেবল ভোগের রোগে যেন শত্রুও কাতর না হয়। জীবন সুন্দর।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com








