ময়নার আগে ভীষণ আফসোস হতো নিজের জীবন নিয়ে, মনে হতো তার স্বামীর যদি সামর্থ্য থাকতো একটা পরার মতো শাড়ি কিনে দেওয়ার, দুবেলা পেট ভরে খেতে দেওয়ার, ছেলেটার লেখাপড়ার খরচ চালানোর সে কক্ষনো লোকের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতে আসতো না দিব্যি স্বামী ছেলেকে নিয়ে সংসার করতো।
কিন্তু এখন ময়নার মনে হয় নিজে উপার্জন করার মতো শান্তি আর কিছু নেই। কোনো কাজই ছোট নয়, সে তো পরিশ্রম করে রোজগার করে। লোকে ভালো বলুক আর খারাপ, খেতে না পেয়ে মরে গেলেও লোকে খোঁজ নিতে আসবে না। এখন মনে হয় দুজন মিলে খেটে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংসার চালানোর আনন্দটাই আলাদা। বাইরের জগতের সাথে না মিশলে ময়না জানতেই পারতো না যে বাইরে থেকে দেখে যাদের মনে হয় ভালো আছে, তারা আসলে ভালো নেই। আসলে টাকা পয়সা সম্পদের দ্বারা মানুষ বিলাসিতা কিনতে পারে, কিন্তু শান্তি নয়।
ময়না এখন ভোর রাতে ঘুম থেকে উঠে রান্না বসায়, উনুনে শুকনো কাঠ ধরিয়ে ছুটোছুটি করে ঘরের কাজ করে, ময়নার সাথে সাথ দেয় তার স্বামী অনন্ত। সব্জি কেটে, চাল ধুয়ে যতোটা পারে সাহায্য করে ময়নাকে। ছেলে বিবেক কিন্তু ঘুমিয়ে থাকে না, তখন দরমার বেড়া দেওয়া ঘরের ওপার থেকে শোনা যায় গড় গড়িয়ে ইংরেজিতে পড়া মুখস্থ করছে তার ছেলে।
রান্না সেরে কাজ গুছিয়ে বরের সাইকেলের পিছনে বসে স্টেশনে যায় ময়না শহরের উদ্দেশ্যে। রাস্তায় দেখে তার মতো আরো মেয়েরা হেঁটে যাচ্ছে স্টেশনের দিকে, কাজে যাওয়ার জন্য। ওরা বলে তুই ভাগ্য করে বর, ছেলে পেয়েছিস ময়না। আমরা ঘরের সব কাজ সেরে কাজে আসি তখন বাড়ির কেউ ঘুম থেকেই ওঠে না, স্টেশনে দিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা।
অনন্ত কখনো চায়নি ময়না কাজে যাক এতো কষ্ট করুক, কিন্তু মাঝেমাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ে অনন্ত। ছোট বেলা থেকে খাটতে খাটতে শরীরের হাল খারাপ। অনন্ত ঘরে বসে গেলে সংসার অচল হয়ে যায়, তাই একপ্রকার জোর করেই ময়না কাজে বেরিয়েছে। অনন্ত বাধ্য হয়েই মত দিয়েছে, নিজের অপারগতার জন্য প্রায়ই দুঃখ করে সে। কিন্তু ময়না উল্টে বলে আমি সাবলম্বী হয়েছি এতে তোমার খুশি হওয়া উচিত।
ময়না এখন তিন বাড়িতে ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে। ঘর মোছা, জামাকাপড় কাচা, বাসন মাজা, রান্না করা এসব করতে হয় তাকে। ময়না ঘর মুছতে মুছতে অবাক হয়ে দেখে কি সুন্দর সুন্দর জিনিস দিয়ে ঘর সাজানো। নরম বিছানা, গদি আঁটা সব চেয়ার, সোফা, টেবিলে সাজানো কতো খাবার, ফল। হঠাৎ জোর চিৎকার শুনে থতমত খেয়ে যায় ময়না। শোনা যায় বাড়ির কর্তা বৌকে বলছে-” পারবো না তোমার বাবার মাসে মাসে এতো টাকার ওষুধ কিনে দিতে, ঘরে বসে জমিদারি করবে আর আমার খাটা পয়সা খসাবে ওটা চলবে না।”
ময়না ভাবতে থাকলো বৌদিমনি তো কতো লেখাপড়া জানে চাইলেই কতো বড় চাকরি করতে পারতো রোজগার করতে পারতো, নিজের বাবার ওষুধের জন্য কারো কাছে হাত পাততে হতো না। এতো টাকাপয়সা থাকার পরেও কেনো এমন করে দাদা বাবু! পাশ থেকে চব্বিশ ঘন্টা থেকে কাজ করা মাধবী বললো -“এখান থেকে চলে আয় ময়না, এটা রোজগার ঘটনা। প্রায় রাতে নেশা করে বাড়ি ফেরে দাদা বাবু, অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্ক তার।
বৌদিমনি কিছু বললেই গায়ে হাত অব্দি তোলে। মেয়ের বিয়ে দিয়ে সর্বস্ব খুইয়ে বৌদিমনির বাবার নিজের ওষুধটুকু কেনার ক্ষমতা নেই আর। ওই ওষুধ টুকুর জন্যও বৌদিমনিকে অপমানিত হতে হয়।”
শুনে চমকে ওঠে ময়না, না তার চাই না বড় বাড়ি, ভালো ভালো খাবার সে এই মানুষ গুলোর থেকে অনেক ভালো আছে। সন্ধ্যেবেলা স্টেশনে নেমে দেখলো অনন্ত ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে, তার পরনের ভিজে গেঞ্জি আর মলিন মুখ বুঝিয়ে দেয় তার পরিশ্রমের মাত্রা।
ময়না কাছে যেতেই বললো -“খেয়েছিলি তো পুরো খাবারটা? মুখটা ওরম লাগছে কেনো? খুব কষ্ট হচ্ছে নারে? চল একটু মাংস কিনবো আজ নিজে রান্না করবো ঝাল ঝাল করে ভাতের সাথে দেবো, দেখবি ভালো লাগবে। আজ প্যাসেঞ্জার হয়েছিল তাই কটা পয়সা হয়েছে।”
ময়না জানে সব দিন ভাড়া খাটতে পারে না অনন্ত, শরীরের জন্য। আর মানুষ ভ্যানে উঠতে চায় না আজকাল, এখন ইঞ্জিন বা ব্যাটারিতে চলা অটো টোটো বেছে নেয় তারা সময় বাঁচানোর জন্য।
বাড়ি ফিরতেই অনন্ত বললোয-“যা ময়না, হাত মুখ ধুয়ে একটু ঘুমিয়ে নে আমি রান্না করে ডাকবো তোকে।” বিবেক বললো- “বাবা, আমি কি কেটে দেবো সব্জি গুলো?”
-” না না বাবু তুই পড়তে বস, আমি সব করে খেতে ডাকবো।”
বিছানায় শুয়ে শুয়ে ময়না ভাবলো তা ময়না ভাগ্যবতী বটে, অনেক মানুষের থেকে সে ভালো আছে.। রোজ রাতে তো সে শান্তির ঘুম ঘুমাতে পারে। সেদিন রাতে অনন্তর হাতের তৈরি ভাত মাংস খেয়ে বিছানায় শুয়ে ময়না বললো -“দেখো ছেলেটা এখনো পড়ছে, প্রায় সারারাত পড়ে বাছা আমার।”
-” পড়ুক ও অনেক, শিখুক, অজানাকে জানুক। আমরা লেখাপড়া না জানার সব কমতি ও পূরণ করুক। তোর ছেলে অনেক ভালো ছাত্র রে, ওর স্যারদের নিয়ে যখন ইস্কুলে দিতে যাই, ওনারা আমায় ধন্যি ধন্যি করে। ওরম ছেলের বাবা হয়ে আমার গর্ব হয় রে, আমার শরীরের সব কষ্ট কোথায় হারিয়ে যায়। বিবেক ঠিক মানুষের মতো মানুষ হবে দেখিস, আমরা গরীব হতে পারি কিন্তু আমরা তো অসৎ নই। ছেলেটাকে ভালো করে মানুষ করবো বলে আমরা আর বাচ্ছা নিইনি। দুটো বাচ্ছাকে যেমন তেমন করে মানুষ করার চেয়ে আমাদের মতো গরীব ঘরে একটা বাচ্ছাকে ভালো করে মানুষ করা অনেক ভালো।”
দেখতে দেখতে বিবেকের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলে এলো। তখন ময়নার কাজের বাড়ির বৌদির ছেলেরও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। ময়নাকে বৌদি সাফ জানিয়ে দিল পরীক্ষা কদিন যেনো একটু আগেই আসে ময়না, ছেলে খেয়ে পরীক্ষা দিতে যাবে।
ময়না বলতে পারলো না, তার ছেলেটারও যে পরীক্ষা। ময়না দেখলো বৌদিমনি ছেলের বলছে-“এই ফোন আমি ছুড়ে ফেলে দেবো, একটু চোখের আড়াল হলেই ফোন নিয়ে বসে যাচ্ছিস আজ বাদে কাল কোনো হুঁশ আছে তার?”
ছেলেও চেঁচিয়ে বলছে -“আমার ফোনটা দাও না হলে কিন্তু আমি পরীক্ষাই দেবো না।”
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে ময়না দেখলো ফোন ছেড়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়লো সে ছেলে। বাড়ি ফিরে ময়না দেখলো উনুনে ভাত ফুটছে, আর পাশে বই হাতে পড়ে চলেছে তার ছেলে বিবেক। ময়না ব্যস্ত হয়ে বললো -“তুই আবার ভাত বসাতে গেলি কেনো?”
বিবেক বললো -“তোমার শরীরটা ভালো নয় মা তাই ভাতটা করে রাখলাম, বাবা তরকারিটা করবে। আমি পড়তে বসলাম, তুমি হাত মুখ ধুয়ে বিশ্রাম নাও আর গ্লাসে লেবুর সরবত করে রেখেছি খেয়ে নাও দেখবে ভালো লাগবে। ময়না চোখ ছলছল করে উঠলো জীবনে আর কি চাই তার? সে যে সব পেয়েই গেছে। জীবনে কষ্ট বোঝার মানুষ, পাশে থেকে এগিয়ে দেওয়ার মানুষ থাকলে আর কিছুই লাগে না যে।
বিবেক বললো-” তোমাকে যে আরো ভোরে কাজে যেতে হবে মা, এই শরীরে রাত জেগে আর আমার জন্য রান্না করতে হবে না, আমি আর বাবা ঠিক ম্যানেজ করে নেবো।
দেখতে দেখতে বিবেকের রেজাল্টের দিন চলে এলো। সেদিন আকাশে কি প্রচন্ড বৃষ্টি। ময়না ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো-” ফেরার সময় মিষ্টি আনবো বাবা, এতো পড়েছিল ফল ঠিক ভালোই হবে।”
আজ কাজে মন নেই ময়নার মনটা বড় অস্থির ময়নার। বৌদিমনি আর বাড়ির সকলে টিভির সামনে বসে, যারা ভালো রেজাল্ট করবে তাদের নাম নাকি বলবে টিভিতে।বিছানা গোছাতে গোছাতে হঠাৎ টিভির দিকে চোখ যেতেই ময়না অবাক হয়ে দেখলো টিভিতে দেখাচ্ছে তার বিবেকের ছবি। উচ্চ মাধ্যমিকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জেলার রত্ন বিবেক সরদার।
আনন্দে চোখে জল চলে এলো ময়নার। বৌদিমনি তার ছেলেকে বলছে -“এতো ভালো স্কুলে পড়িয়ে, এতো এতো টিউশন দিয়ে কি হল? এক থেকে দশের মধ্যে থাকতে পারলি না। দ্যাখ সেই প্রথম দশ জুড়ে আলো করে বসে আছে গ্রামের ছেলেমেয়ে গুলো। দ্বিতীয় হয়েছে পরিচারিকার ছেলে দ্যাখ দ্যাখ।”
ময়না কিছু বললো না, ও জানে বললেই রনি আরও বকা খাবে। কিন্তু ময়নার কাজের স্পিড দশগুণ বেড়ে গেল, তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বেরিয়ে পড়লো বাড়ির উদ্দেশ্যে।
স্টেশনে নামতেই ময়না শুনলো,
-“তাড়াতাড়ি বাড়ি যা ময়না, তোর ছেলে গোটা গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছে রে। সে এমন ভালো ফল করেছে পরীক্ষায় সাংবাদিক, পুলিশ, নেতারা সব ভীড় করেছে তোর বাড়িতে।”
বাড়ি ফিরেই দূর থেকে দেখলো সাংবাদিকরা বলছেন-” এমন ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রের মাকে দেখতে চাই আমরা।”
ময়না এবার আনন্দে কেঁদেই ফেললো, অনন্ত বলছে-” ও কাজে গেছে, ওর ট্রেন থেকে নামার সময় হয়ে গেছে আমি গিয়ে ওকে নে আসি। ছেলেটার মানুষ করার জন্য ও মা হয়ে যা করেছে আমি বাপ হয়ে তা পারিনি।”
না ময়নার আর কিচ্ছু চাই না। নিজেকে জগতের সেরা সুখী মানুষ মনে হল,সে তার পরম প্রাপ্তি যে পেয়ে গেছে।
পরের দিন তিন বাড়িরই মালকিনদের মুখ ভার, এইভাবে না বলে ছুটি করা কি মেনে নেওয়া যায়? তাও একটা ফোন নেই ময়নার কাছে যে, যোগাযোগ করতে পারবে তারা। দুপুরে টিভি চালিয়ে বিশ্বাসই হচ্ছিল না তাদের, তাদেরই বাড়ির ঠিকে ঝিকেই দেখছে তারা একজন গর্বিত মা হিসাবে একজন সফল ছাত্রের মা হিসাবে। এ সম্মান পাওয়া যে পরম ভাগ্যের ব্যাপার।
ময়নার জীবনী ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Post Views: 206
Related