অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার সময় লিবিয়ায় মাফিয়াদের গুলিতে নিহত হয়েছেন মাদারীপুরের তিন যুবক। সমুদ্রে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় দুর্বৃত্তরা গুলি ছুড়লে প্রাণ হারান তারা। পরে তাদের লাশ ফেলে দেওয়া হয় সাগরে।
নিহতরা হলেন- মাদারীপুর সদর উপজেলার কুনিয়া ইউনিয়নের আদিত্যপুর গ্রামের হাজী মো. তৈয়ব আলী খানের ছেলে ইমরান খান (২২), রাজৈর উপজেলার দুর্গাবদ্দী গ্রামের ইমারত তালুকদারের ছেলে মুন্না তালুকদার (২৪) এবং একই উপজেলার ঘোষলাকান্দি গ্রামের কুদ্দুস শেখের ছেলে বায়েজিত শেখ (২০)।
নিহতের স্বজনরা জানান, গত ৮ অক্টোবর সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন ইমরান খান। সরাসরি ইতালি পৌঁছে দেবে, এমন শর্তে প্রতিবেশী ও মানবপাচারচক্রের সদস্য শিপন খানের সঙ্গে ২২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। কিন্তু ইমরানকে লিবিয়া আটকে নির্যাতন করে পরিবার থেকে আরও ১৮ লাখ টাকা আদায় করা হয়। শেষমেশ ১ নভেম্বর লিবিয়া থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করলে ভুমধ্যসাগরে মাফিয়ার গুলিতে মারা যায় ইমরান। পরে মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) ইমারনের মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।
শুধু ইমরানই নয়, একইভাবে মাফিয়াদের গুলিতে ওইদিন মারা যান রাজৈর উপজেলার দুর্গাবর্দ্দী গ্রামের ইমারত তালুকদারের ছেলে মুন্না তালুকদার ও একই উপজেলার ঘোষলাকান্দি গ্রামের কুদ্দুস শেখের ছেলে বায়েজিত শেখ।
ঘটনা জানাজানি হলে ঘরে তালা ঝুলিয়ে লাপাত্তা দালালক্রের পরিবার। তবে দালাল শিপনের স্বজনদের দাবি, এই ঘটনায় শিপন জড়িত নয়, তিনি জোর করে কারও পাসপোর্ট নেননি।
অভিযোগ আছে, কয়েক বছর ধরে লিবিয়ায় অবস্থান করছে শিপন। এরপর আত্মীয়-স্বজনরদের মাধ্যমে এলাকার যুবকদের খুব সহজে ইতালি নেয়ার প্রলোভন দেয় সে। এর আগেও মৃত্যুর মতো এমন ঘটনা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে অভিযুক্ত।
ইমরানের বড় বোন ফাতেমা আক্তার বলেন, ‘শিপন দালাল আমার ভাইকে মেরে ফেলেছে। এই দালালের কঠিন বিচার চাই। আর সরকারের কাছে দাবি, আমার ভাইয়ের লাশটি যেন একবারের জন্য হলেও দেখতে পারে, সেই পদক্ষেপ নেয়ার।’
ইমরানের আত্মীয় সাজ্জাদ মাতুব্বর বলেন, ‘দালাল শিপনের হাত অনেক লম্বা। এর আগেও একইভাবে কয়েকজন যুবকের মৃত্যু হয়েছে। টাকা দিয়ে সবাইকে ম্যানেজ করে সে। শিপন খানের কোনো বিচার না হওয়ায় এই অপরাধ থামছেই না। আমরা দালাল শিপন ও তার সহযোগীদের কঠিন বিচার দাবি করছি।’
নিহত মুন্নার খালা খাদিজা আক্তার বলেন, ‘দালাল শিপনকে ধারদেনা করে ৪০ লাখ টাকা দিয়েছি। আমার ভাগ্নের মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। এই দালালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
বায়েজিতের বাবা কুদ্দুস শেখ বলেন, ‘আমার ছেলের এমন মৃত্যু কীভাবে মেনে নেব? দালাল প্রথমে স্বীকার যায়নি, পরে লিবিয়া থেকে আমাদের জানানো হয়। এই দালাল এখন লাপাত্তা। এতগুলো টাকা দিয়ে ছেলের এমন মৃত্যুর শোক কীভাবে সইব?
দালাল শিপনের চাচি সেতারা বেগম বলেন, ‘শিপন অনেক মানুষকেই নিয়েছে। কিন্তু গুলিতে কেউ মারা গেছে, বা শিপন কাউকে গুলি করে মেরে ফেলেছে, এমন ঘটনা আমরা এর আগে কখনই শুনিনি। শিপন লিবিয়ায় অবস্থান করছে। ওর পরিবারের লোকজনও এখন বাড়িতে নেই। ঘরে তালা ঝুলছে। আমরা এর বেশি কিছু বলতে পারব না।’
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম জানান, ‘লিবিয়ায় গুলিতে তিন যুবকের মৃত্যুর খবর বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি। এই ঘটনায় নিহতের পরিবার থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দালালদের কোন প্রকারেই ছাড় দেয়া হবে না।’






