বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ছিল এক বিস্ময়কর রূপান্তরের গল্প। এক সময়ের সাদামাটা গৃহবধূ থেকে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সবচেয়ে দৃঢ় কণ্ঠ। তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসার বহু আগেই তার জীবন বদলে যায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে। সেদিন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন খালেদা জিয়া। তখন তিনি ছিলেন ঢাকা সেনানিবাসে বসবাসরত এক সাধারণ গৃহবধূ, যার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা সক্রিয়তা—কোনোটিই দৃশ্যমান ছিল না।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। রাজনৈতিক মহলে তাকে দুর্বল নেতৃত্ব হিসেবে দেখা হতো, যা সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তিগুলোর জন্য ছিল স্বস্তিকর। একই সময়ে বিএনপিও ভুগছিল চরম সংকটে—নেতৃত্বহীনতা, অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও দিকনির্দেশনার অভাব দলটিকে প্রায় অকার্যকর করে তুলেছিল।
দলের ভেতরে নতুন নেতৃত্ব গঠনের দাবি উঠলেও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পছন্দের বাইরে কেউ যেন উঠে না আসে—এমন বাস্তবতায় খালেদা জিয়ার নাম ক্রমেই আলোচনায় আসতে থাকে। প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদের বর্ণনায়, সে সময় ক্ষমতাকেন্দ্রের সবচেয়ে বড় শঙ্কা ছিলেন খালেদা জিয়া—কারণ তিনি প্রার্থী হলে তাকে টেক্কা দেওয়ার মতো বিকল্প খুব কমই ছিল।
রাজনীতিতে অনিচ্ছাকৃত প্রবেশ
স্বামীর জীবদ্দশায় খালেদা জিয়াকে কখনোই প্রকাশ্য রাজনীতিতে দেখা যায়নি। সাংবাদিক শফিক রেহমানের ভাষায়, তিনি ছিলেন লাজুক, পরিবারকেন্দ্রিক এক নারী—যার প্রধান পরিচয় ছিল দুই ছেলের মা হিসেবে। স্বামীর আকস্মিক হত্যাকাণ্ডের পর রাজনীতিতে জড়ানো নিয়ে তার ভেতরে ছিল ভয় ও দ্বিধা।
সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ তার জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক জীবনের পরিণতি কী হতে পারে—এই শঙ্কাই তাকে দীর্ঘদিন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগিয়েছে। তবু দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার তাগিদ এবং নেতাকর্মীদের অনবরত অনুরোধে অবশেষে রাজনীতিতে পা রাখেন তিনি।
১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। একই বছরের নভেম্বরে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে দেওয়া বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে তার উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন—যা সামরিক শাসকগোষ্ঠীর জন্য ছিল অস্বস্তিকর এক বাস্তবতা।
স্বৈরশাসনবিরোধী সংগ্রাম ও ‘আপসহীন’ পরিচয়
এরশাদের শাসনামলে খালেদা জিয়া আপসের পথে হাঁটেননি। ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচন বর্জন, কারচুপির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার গ্রেপ্তার হন তিনি।
এই সময়েই সাতদলীয় জোট গঠন, রাজপথের আন্দোলন এবং স্বৈরাচারবিরোধী অবস্থানের মধ্য দিয়ে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান। এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।
তার প্রথম মেয়াদেই বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হয়। তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়ে, যেখানে বিপুল সংখ্যক নারী যুক্ত হন।
ক্ষমতা, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক ভূমিকা
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় হন খালেদা জিয়া। জাতিসংঘে গঙ্গার পানি বণ্টনের প্রশ্ন উত্থাপন, হোয়াইট হাউসে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা—এসব কূটনৈতিক উদ্যোগ তার নেতৃত্বের দৃঢ়তা তুলে ধরে।
১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এলেও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে এক মাসের মাথায় তিনি পদত্যাগ করেন। নির্বাচনে পরাজিত হলেও সংসদে বৃহৎ বিরোধী দলের নেতৃত্ব দেন তিনি।
২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে ফের ক্ষমতায় আসেন খালেদা জিয়া। নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় স্থান দেয়।
কারাবরণ ও গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়
২০০৭ সালের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার, গৃহবন্দী ও নির্বাসনের চেষ্টার মুখে পড়তে হয়। দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
পরবর্তীতে আপিল বিভাগের রায়ে সব মামলায় খালাস পান খালেদা জিয়া ও তার পরিবার। আদালত রায়ে উল্লেখ করে—অভিযোগের পক্ষে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
ক্ষমতায় থাকাকালে শিক্ষা, নারী উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে নেওয়া উদ্যোগ—এবং ক্ষমতার বাইরে থেকেও গণতন্ত্রের পক্ষে অবিচল অবস্থান—খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
নিভৃত গৃহজীবন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা, কারাগার থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব—খালেদা জিয়ার জীবন তাই শুধু একজন রাজনীতিকের নয়, বরং একটি সময়ের সংগ্রাম ও সাহসের প্রতিচ্ছবি।







