১৭ জানুয়ারি- বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’ করা হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তাঁর চিকিৎসক অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী। এ বিষয়ে আইনগতভাবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি তদন্ত কমিটি গঠনেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় খালেদা জিয়ার নাগরিক শোকসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এফএম সিদ্দিকী বলেন, চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই জীবনের শেষ সময়ে খালেদা জিয়াকে ‘অবর্ণনীয় কষ্ট’ ভোগ করতে হয়েছে, যা তাঁর প্রাপ্য ছিল না। তিনি বলেন, এই অবহেলার পেছনে কারা দায়ী, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
এফএম সিদ্দিকী
এফএম সিদ্দিকী তার বক্তব্যে তিনটি বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের প্রস্তাব দেন। প্রথমত, সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য কারা ছিলেন এবং কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে তাঁরা খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসাকালীন কোন কোন চিকিৎসক সরাসরি চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন এবং তাঁদের পক্ষ থেকে অবহেলার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কি না। তৃতীয়ত, চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়া আইনজীবীর মাধ্যমে নিজের পছন্দের চিকিৎসকদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কেন তা সম্ভব হয়নি এবং কারা এতে বাধা দিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত সব নথিপত্র আইনগতভাবে জব্দ করা প্রয়োজন।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যান খালেদা জিয়া। পরবর্তী সময়ে আরও দুটি মামলায় তাঁর সাজা বাড়ে। কারাবন্দি অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল তাঁকে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে একটি সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ডের অধীনে তাঁর চিকিৎসা চলে, যা নিয়ে সে সময় থেকেই বিএনপি আপত্তি জানিয়ে আসছিল।
এফএম সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, লিভার রোগে আক্রান্ত খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার সময় মারাত্মক অবহেলা করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, রিউমাটয়েড আর্থরাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘মেথোট্রেক্সেট’ নামের ওষুধটি নিয়মিত দেওয়া হলেও লিভার ফাংশন পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। অথচ এই ওষুধ লিভারের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়ার লিভার ফাংশন টেস্ট ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফল দেখালেও দীর্ঘ দেড় বছরে একটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি পর্যন্ত করা হয়নি। এফএম সিদ্দিকীর মতে, এ ধরনের অবহেলা একজন সাধারণ রোগীর ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্য নয়, সেখানে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এমন চিকিৎসা পাওয়াটা বিস্ময়কর।
এফএম সিদ্দিকী আরও দাবি করেন, পরবর্তী সময়ে যখন তাঁরা খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন, তখন পরীক্ষায় দেখা যায় তিনি লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। তাঁর মতে, নিয়মিত মেথোট্রেক্সেট সেবনের ফলে খালেদা জিয়ার ফ্যাটি লিভার দ্রুত সিরোসিসে রূপ নেয়। এই প্রেক্ষাপটে ওষুধটি কার্যত ‘স্লো পয়জন’ হিসেবে কাজ করেছে।
তিনি বলেন, “এটি নিছক অবহেলা নয়, এটি ইচ্ছাকৃত অবহেলা। এই অবহেলা অমার্জনীয়। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পেছনে কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
শোকসভায় বক্তব্যের শেষদিকে এফএম সিদ্দিকী বলেন, দেশের মানুষের মনে আজ গভীর আক্ষেপ রয়ে গেছে। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানুষের অধিকারের জন্য যিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন, তিনি যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন এবং একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশে দেশের মানুষকে ভোট দিতে দেখতেন, তাহলে তা হতো জাতির জন্য এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।







