‘সবাই রাজুতে আয়’। হাসনাত আব্দুল্লাহর একটি আহ্বান। যা জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী আওয়ামী সহিংসতা ঠেকানোর যুগান্তকারী এক আহ্বান। এই রাজু মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে অবস্থিত সন্ত্রাস বিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য। প্রশ্ন হলো কে এই রাজু? কীভাবে তাঁর ঠাঁই হলো এই ভাস্কর্যে?
রাজুর পুরো নাম মঈন হোসেন রাজু। বরিশালের জেলার মেহেন্দীগঞ্জের এই তরুণ ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। ১৯৯২ সালের ১৩ই মার্চ গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের সন্ত্রাস বিরোধী মিছিল চলাকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের গোলাগুলির সময় ছাত্রদলের গুলিতে মঈন হোসেন রাজু নিহত হন। এর ৫ বছর পর ১৯৯৭ এর শেষভাগে তৈরি হয় সন্ত্রাস বিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য।
কী ঘটেছিল সেদিন?
১৯৯২ সালের ১৩ই সকাল ১০ টার পরপরই রাজু ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। সেইদিন ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির উত্তপ্ত পরিবেশ ছিলো, ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে মারামারি চলছিলো। রাজু ক্যাম্পাসে মারামারির কথা শুনে মধুর ক্যান্টিনে যান, তিনি সেখানে দেখতে পান, ছাত্রদলের কর্মীরা ছাত্রশিবিরের এক কর্মীকে মারধর করছিলেন। শিবিরকর্মীকে বাঁচাতে গিয়ে রাজু আহত হন, তার হাত কেটে যায়। রাজু হাতে ব্যান্ডেজ করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলে নিজের কক্ষে যান এবং হল থেকে নিজের বাসায় যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন। কিন্তু বন্ধুরা অসুস্থ শরীর নিয়ে বাসায় না যাওয়ার পরামর্শ দেন।
বিকালে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিলো। মাহমুদ, সাইফুর রহমান ও মোস্তাফিজ নামে তিন বন্ধুর সাথে বের হয়ে ঘুরতে ঘুরতে টিএসসিতে গিয়ে বসেন। টিএসসির প্রধান ফটকে তখন ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের বাকবিতণ্ডা চলছিলো। পরে ছাত্রদলের সদস্যরা হাকিম চত্বরের দিকে এবং ছাত্রলীগের সদস্যরা শামসুন নাহার হলের দিক থেকে অনবরত গুলি ছুড়ছিল। তখন পুলিশ সদস্যরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পশ্চিম ফটকে অবস্থান করছিলো, এবং পুলিশের দুই পাশে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ অবস্থান করছিলো। পুলিশ তখন টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালাচ্ছিলো।
তবে সেই সময়ে বৃষ্টি হতে শুরু করে ও ঝোড়ো হাওয়া বইতে থাকে, ফলে উভয় দলের সন্ত্রাসীরা গোলাগুলি বন্ধ করে দেয়। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরে পুলিশ ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্ন্যাকসের (ডাস) কাছাকাছি অবস্থান নেয়। তবে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের কর্মীরা তখনো যথাক্রমে হাকিম চত্বর ও শামসুন নাহার হলের সড়কদ্বীপে অবস্থান করছিলো। তখন পুলিশ অস্ত্রধারীদের কিছু না বলে উল্টো সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের টিএসসি থেকে সরে যেতে বলে। পুলিশ রাজু ও তার বন্ধুদেরও টিএসসি থেকে সরে যেতে বলে।
রাজু তখন পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে পুলিশ কর্মকর্তাকে বলেন, “আপনারা কী দেখছেন তা তো আমরা সবাই দেখলাম। আপনার দুই পাশে থাকা সন্ত্রাসীদের কি চোখে পড়ছে না?”
পুলিশ কর্মকর্তা রাজুর উপরে বিরক্ত হয়ে অন্য পুলিশদের আদেশ করতে থাকেন, ‘এই ছেলেকে ধর’। তখন রাজু উত্তেজিত হয়ে নিজের বুকের শার্টে হাত ধরে বলেন, ‘ধর আমাকে’। রাজুর বন্ধুরা রাজুকে শান্ত করে টেনে টিএসসির ঠিক মাঝখানটায় নিয়ে যায়। রাজুকে পুলিশের বিরুদ্ধে অশান্ত হতে নিষেধ করে।
কিছুক্ষণ পরে রাজু ও তার বন্ধুরা আলোচনা করে গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য নামক সংগঠনের নামে একটা মিছিল বের করে এবং স্লোগান দিতে থাকে। ১০/১২ জনের একটা মিছিল টিএসসির পূর্ব গেট ধরে ঘুরে হাকিম চত্বরের পাশ দিয়ে বর্তমান রাজু ভাস্কর্য ঘুরে টিএসসিতে অবস্থান নেয়। ততক্ষণে মিছিলে আরো অনেক সাধারণ শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়। মিছিল শেষে সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সমাপনী বক্তব্য দেবার সময় আবারো গোলাগুলি শুরু হয়। রাজু ও মিছিলের অন্যান্য সঙ্গীরা সিদ্ধান্ত নেয় অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে আবারো একই পথে মিছিল করবে। মিছিল টিএসসির পূর্ব গেট ধরে স্বোপার্জিত স্বাধীনতা ভাস্কর্য অতিক্রম করে কিছু দূর যাওয়ার পরেই অস্ত্রধারীরা মিছিলের উপর গুলি করে।
দ্বিতীয় ধাপে মিছিল চলাকানীল সময়ে অস্ত্রধারীরা গুলি বর্ষণ করলে রাজু গুলিবিদ্ধ হন। পাশেই তার বন্ধু মাহমুদ ছিলো, মাহমুদ হাঁটু গেড়ে বসতেই রাজু মাহমুদের কাঁধে হেলে পরেন। মিনিট পাঁচেক পরে আরো দুইজন ব্যক্তি তাদেরকে সাহায্য করার জন্য আসলে, রাজুকে তৎক্ষণাৎ রিকশা করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালেই রাজু মৃত্যুবরণ করেন।
পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও রাজু ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা
রাজুর স্মরণে ও সন্ত্রাসবিরোধী চেতনা ধরে রাখার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ভাস্কর্য নির্মাণের চিন্তা করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাস বিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণের পর উদ্বোধন করা হয়। ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী এটির নকশা করেন। ভাস্কর্যে আটজন ব্যক্তির অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যারা রয়েছেন ভাস্কর্যে তারা হলেন- মুনীম হোসেন রানা, শাহানা আক্তার শিলু, সাঈদ হাসান তুহিন, আবদুল্লাহ মাহমুদ খান, তাসফির সিদ্দিক, হাসান হাফিজুর রহমান সোহেল, উৎপল চন্দ্র রায় ও গোলাম কিবরিয়া রনি।
রাজু হত্যার ৩৪ বছর পেরিয়েছে। বহু শাসন পার করেছে বাংলাদেশ। তবুও কোনো বিচার হয়নি রাজু হত্যার। মাঝে মাঝে বিচারের দাবি ওঠে। কিন্তু আবারও তা নিভে যায়। আবারও নতুন সরকার পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাজনীতিতে অন্যতম নিয়ামক হয়ে ওঠা ভাস্কর্যের মানুষটি আজও হয়তো নীরবে নিভৃতে কাঁদে বিচার না পেয়ে।








