বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে টিকে থাকা এবং বারবার ফিরে আসার এক অনন্য উপাখ্যানের নাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৯৭৮ সালে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। গত দেড় দশকের দুঃশাসন, দমন-পীড়ন আর ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বিএনপির এই পুনরুত্থান কেবল একটি দলের বিজয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দলটি যখন অস্তিত্বের সংকটে, তখন হাল ধরেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন লড়াই তাঁকে পরিণত করেছিল ‘আপসহীন নেত্রী’তে। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২০০৮ পরবর্তী কঠিন সময়েও তিনি দমে যাননি। বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ থাকা, ছোট ছেলের মৃত্যুশোক, আর অসুস্থ শরীরে পরিত্যক্ত কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠ—সবকিছুই তিনি সহ্য করেছেন গণতন্ত্রের প্রশ্নে। তিনি দয়া চাননি, বরং মাথা উঁচু করে লড়েছেন। এক মমতাময়ী মায়ের মতো তিনি প্রতিকূল সময়েও দলকে আগলে রেখেছেন আষ্টেপৃষ্ঠে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়কাল ছিল বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে ট্র্যাজিক অধ্যায়। গুম, খুন আর গায়েবি মামলার রাজনীতি বিরোধী শক্তিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক মহোৎসবে মেতেছিল বিদায়ী শাসকেরা। এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম বা সাজেদুল সুমনের মতো অসংখ্য নেতাকর্মী নিছক রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে হারিয়ে গেছেন ‘আয়নাঘর’ কিংবা অন্ধকারের অতলে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এর প্রহসনের নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে যখন গণতন্ত্রকে কফিনে বন্দি করা হয়েছিল, তখনও রাজপথের লড়াই থামতে দেয়নি বিএনপি। নেতাকর্মীদের রক্ত আর আত্মত্যাগই ছিল দলটির টিকে থাকার মূল জ্বালানি।
বিগত ১৭ বছরের এই কঠিন সময়ে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তারেক রহমান। শারীরিক নির্যাতন আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বিদেশে নির্বাসিত জীবন কাটাতে বাধ্য হলেও, তিনি এক মুহূর্তের জন্যও দেশের মাটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি। প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে লন্ডনে বসেই তিনি যুক্ত ছিলেন তৃণমূলের সঙ্গে। অনলাইন বৈঠক আর ভার্চুয়াল নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি শতধা বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে দলকে গেঁথে রেখেছিলেন এক সুতোয়। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই সুদূরপ্রসারী ও দৃঢ় নেতৃত্ব না থাকলে বিএনপি হয়তো আজ ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যেত।
২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন সূর্যোদয় ঘটিয়েছে, তার অন্যতম সারথি বিএনপি। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের বীরোচিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একজন নেতার ফেরা নয়, এটি ছিল গণতন্ত্রের ঘরে ফেরার নামান্তর। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে জুতো খুলে নিজ দেশের মাটিতে হাঁটা কিংবা একমুঠো মাটি হাতে তুলে নেওয়ার সেই দৃশ্য দেশবাসীকে আবেগাপ্লুত করেছে। এটি ছিল শিকড়ের প্রতি টান এবং পূর্বপুরুষদের স্বপ্নের প্রতি দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ।
তারেক রহমানের ঘোষণা স্পষ্ট—ক্ষমতায় গেলে কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়। তাঁর লক্ষ্য লুণ্ঠিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র ও সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে নতুন সরকারের প্রধান কাজ। দেড় দশকের লড়াইয়ে নেতাকর্মীরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তার সার্থকতা মিলবে একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর দেশ আজ মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। বিএনপির এই দীর্ঘ যাত্রা প্রমাণ করে যে, জনবিচ্ছিন্ন শক্তি বন্দুকের জোরে ক্ষমতা ধরে রাখলেও, জনগণের হৃদয়ে প্রোথিত শক্তিকে কখনোই নির্মূল করা যায় না। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন সেই ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার পথে, যেখানে বিচার মিলবে প্রতিটি হত্যার, ফিরে আসবে প্রতিটি নিখোঁজ মানুষের উত্তর এবং প্রতিষ্ঠিত হবে প্রকৃত গণমানুষের শাসন।







