মুরগির মাংস আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় অন্যতম প্রধান প্রোটিন উৎস। অন্যদিকে, ব্রয়লার না দেশি মুরগির মাংস নিয়ে এই বিতর্ক বহুদিনের। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অন্যতম প্রধান প্রোটিন উৎস হওয়ায় কোনটি বেশি পুষ্টিকর, তা জানার আগ্রহও কম নয়। ক্যালোরি, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান সবদিক থেকেই দুই ধরনের মুরগির পুষ্টিমান নিয়ে রয়েছে নানা আলোচনা।
ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট, ফ্যাটি অ্যাসিড প্রোফাইল এবং উৎপাদন পদ্ধতির ভিত্তিতে ব্রয়লার ও দেশি মুরগির পুষ্টিগুণ নিয়ে চ্যানেল 24 অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন রোহিঙ্গা কনটেস্টে এনজিওর পুষ্টিবিদ চামিলি জান্নাত। তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কোন ক্ষেত্রে কোনটি এগিয়ে, আর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে কীভাবে মুরগির মাংস অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
প্রতি ১০০ গ্রাম রান্না করা মাংসের পুষ্টিমান
ব্রয়লার মুরগি
- ক্যালোরি: ১৬৫–১৯০ কিলোক্যালরি
- প্রোটিন: ২৭–৩১ গ্রাম
- ফ্যাট: ৭–১২ গ্রাম
- আয়রন: ১–১.৩ মি.গ্রা.
- ভিটামিন বি১২: ০.২–০.৩ মাইক্রোগ্রাম।
দেশি মুরগি
- ক্যালোরি: ১৪০–১৭০ কিলোক্যালরি
- প্রোটিন: ২৫–২৯ গ্রাম।
- ফ্যাট: ৪–৮ গ্রাম।
- আয়রন: ১.৩–১.৮ মি.গ্রা.
- ভিটামিন বি১২: ০.৩–০.৪ মাইক্রোগ্রাম।
- ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: তুলনামূলক বেশি।
পুষ্টিমান খাদ্য, পরিবেশ ও পালন পদ্ধতির উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।

প্রোটিনের গুণগত মান
উভয় মুরগিই পর্যাপ্ত প্রোটিন দেয়, অর্থাৎ এতে সব অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড বিদ্যমান। তবে দেশি মুরগি ধীরে বৃদ্ধি পায় ও বেশি চলাফেরা করে, ফলে এর পেশী টিস্যু ঘন হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে অ্যামাইনো অ্যাসিড ঘনত্ব সামান্য উন্নত হতে পারে।
এটি পেশী গঠন, টিস্যু রিপেয়ার ও ইমিউন ফাংশনের জন্য উপকারী।
ফ্যাট ও হার্টের স্বাস্থ্য:
দেশি মুরগির ফ্যাট তুলনামূলক কম এবং ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অনুপাত কিছুটা ভালো।বৈজ্ঞানিকভাবে ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড—
- খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সহায়ক
- হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক
- প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখে
অন্যদিকে ব্রয়লার মাংসে মোট ফ্যাট কিছু ক্ষেত্রে বেশি থাকতে পারে, বিশেষত চামড়াসহ খেলে।
মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট গুরুত্ব
দেশি মুরগিতে আয়রন ও জিঙ্ক তুলনামূলক সামান্য বেশি থাকতে পারে, যা—
১.রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে সহায়ক
২.রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে
৩.স্নায়ুতন্ত্র ও রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করে
অ্যান্টিবায়োটিক ও উৎপাদন প্রক্রিয়া:
- বাণিজ্যিক ব্রয়লার খামারে কখনও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হতে পারে, তবে বর্তমানে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় তা সীমিত।
- দেশি মুরগি সাধারণত প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় হয়, ফলে অতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহার তুলনামূলক কম।
তবে নিরাপদ ও সঠিকভাবে পরিচালিত খামারের ব্রয়লারও স্বাস্থ্যঝুঁকিমুক্ত হতে পারে।
পুষ্টিগত চূড়ান্ত মতামত:
- উভয়ই উচ্চমানের প্রোটিন উৎস
- কম ফ্যাট ও তুলনামূলক উন্নত ফ্যাটি অ্যাসিড প্রোফাইলের কারণে দেশি মুরগি পুষ্টিগতভাবে কিছুটা এগিয়ে
- তবে বাজেট ও প্রাপ্যতার ভিত্তিতে নিরাপদ ব্রয়লারও স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
স্বাস্থ্যকরভাবে খাওয়ার নির্দেশনা: পুষ্টিবিদ চামিলি জান্নাত স্বাস্থ্যকরভাবে মুরগি খাওয়া নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জানান, চামড়া বাদ দিয়ে খাওয়াই ভালো। এছাড়া রান্নার সময় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করা যাবে না। সবজি ও পূর্ণ শস্যের সঙ্গে মুরগি মিলিয়ে খাওয়া উচিত। সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার লিন প্রোটিন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্য সচেতনতা, হার্টের স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির ভারসাম্যের কথা বিবেচনা করলে দেশি মুরগি সামান্য এগিয়ে। তবে নিরাপদ উৎসের ব্রয়লারও সুষম খাদ্যের অংশ হতে পারে।
ব্রয়লার ও দেশি মুরগি দুটিই উচ্চমানের প্রোটিনের ভালো উৎস এবং সুষম খাদ্যে রাখা যায়। দেশি মুরগিতে ফ্যাট কম ও আয়রন-ওমেগা–৩ কিছুটা বেশি থাকতে পারে, যা হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পালন করা ব্রয়লারও পুষ্টিকর। তাই ব্যক্তির স্বাস্থ্য, বাজেট ও প্রাপ্যতা অনুযায়ী নির্বাচন করা উচিত। সঠিক রান্না পদ্ধতি ও চামড়া বাদ দিয়ে খেলে উভয়ই স্বাস্থ্যকর খাদ্যের অংশ হতে পারে।








