মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত তীব্র হওয়ার ঘটনায় বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন-তারা যেন মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে প্রণালিতে চলাচলরত জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তবে ট্রাম্পের এই আহ্বানে এখন পর্যন্ত বড় কোনো মিত্র দেশ প্রকাশ্যে সমর্থন জানায়নি, ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ধরনের নীরব প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দিয়েছেন, বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে ‘নিরাপদ ও উন্মুক্ত’ রাখতে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোকে নৌবাহিনী পাঠানো উচিত। তার দাবি, ইরান কৃত্রিমভাবে এই পথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
কিন্তু বাস্তবে দেশগুলো খুব সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ প্যাঙ্গিউ বলেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সব পক্ষের দায়িত্ব, তবে উত্তেজনা কমাতে সংলাপই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।
ইরান অবশ্য পাল্টা কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনি ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘ট্রাম্প তো বলেছেন ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে। যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে সাহস থাকলে তিনি তার জাহাজগুলো পারস্য উপসাগরে পাঠাচ্ছেন না কেন।’
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। এই জলপথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল রপ্তানি হয়। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে শত শত তেলবাহী জাহাজ আটকে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কূটনৈতিক উদ্যোগও চলছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অন্তত দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী গ্যাস ট্যাংকার নিরাপদে প্রণালি অতিক্রম করতে পেরেছে। তার মতে, সংঘাত নয় বরং সমন্বয় ও আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের সমাধান সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির সংকট কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি। মার্কিন থিঙ্ক ট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের গবেষক বারবারা স্লাভিন বলেন, ‘চীন সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নৌজোটে যোগ দেবে না, কারণ ইরানি তেল ইতিমধ্যেই চীনের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।’
ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র নৌজোট গঠনের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে অনেক দেশ সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বৈশ্বিক উত্তেজনা ক্রমেই নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা






