আজ ১০ এপ্রিল ২০২২, দুপুর ২ টায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ৫১তম বাষির্কী উপলক্ষে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারের আয়োজন করেছে। ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ’ শীর্ষক এই ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক এমপি। এতে প্রধান বক্তা ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং ’৭২-এর সংবিধানের অন্যতম রচয়িতা ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম।
নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই ওয়েবিনারে অন্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর-এর সভাপতি বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, শহীদ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ, নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর যুগ্মসম্পাদক লেখক সাংবাদিক সাব্বির খান এবং নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল।
প্রধান অতিথি মাননীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক এমপি বলেন, ‘নির্মূল কমিটি যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে, সে অবস্থানের সাথে আমরা সম্পূর্ণ একমত। আমরা ধর্মরক্ষা কিংবা কোনো গানের জন্য যুদ্ধ করিনি, আমরা যুদ্ধ করেছি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তিলাভের জন্য। মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নিয়ে কাজ করছে। ড. লতা সমাদ্দার ও হৃদয় মণ্ডলের সাম্প্রতিক ঘটনাতেও সরকার যা করা দরকার করবে। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার শিকড় খুব গভীরে, এতো সহজে তা উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করছে নির্মূল কমিটি। তাদের আন্দোলনের সঙ্গে দেশের প্রগতিশীল ব্যক্তি ও সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে।’
সভাপতির সূচনা বক্তব্যে নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির আন্তর্জাতিক আইনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বৈধতা এবং এই ঐতিহাসিক ঘোষণাকে সংবিধানের সৃষ্টিতত্ত্ব হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ পাকিস্তানপ্রেমী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এবং তাদের সহযোগীরা প্রতিনিয়ত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক চেতনাকে শুধু অস্বীকারই করছে না, একে ধ্বংস করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কোন প্রেক্ষাপটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ’৭১-এর ২৬ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের এই ঘোষণাপত্র অনুমোদন করেছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অস্বীকার করছে বিএনপি এবং তাদের সহযোগীরা। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা ছিল, যা মূর্ত হয়েছে বাংলাদেশের মূল সংবিধানে গৃহীত রাষ্ট্রের চার মূলনীতি এবং ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের ভেতর। দুর্ভাগ্যের বিষয় বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সংবিধান থেকে রাষ্ট্রের মূলনীতি মুছে ফেলে পাকিস্তানের আদলে সমাজ ও রাষ্ট্রের যে মৌলবাদীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণ আরম্ভ হয়েছে তা এখনও বন্ধ হয়নি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান ’৭২-এর সংবিধানে নিষিদ্ধকৃত ধর্মের নামে রাজনীতি চালু করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র বানাতে চেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর দল একটানা ১৩ বছর ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে আমরা যে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে পারিনি তার অতি সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে কপালে টিপ পরার কারণে পুলিশ কর্তৃক কলেজ শিক্ষক ড. লতা সমাদ্দারের লাঞ্ছনা এবং স্কুলশিক্ষক হৃদয়চন্দ্র মণ্ডলের চরম নিন্দনীয় গ্রেফতারের ঘটনা। প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির শেকড় বিস্তৃত হয়েছে তা এ দুটি ন্যক্কারজনক ঘটনায় আবারও মূর্ত হয়েছে। আজকের সভা থেকে আমরা অবিলম্বে হৃদয়চন্দ্র মণ্ডলের মামলাসহ রসরাজ, সঞ্জু বর্মণ, জয়দেব, সৌরভ, টিটু রায় ও ঝুমন দাসসহ সকল সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার দাবি করছি এবং লতা সমাদ্দারকে লাঞ্ছনার জন্য দায়ী পুলিশের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি ধর্মনির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণের জন্য অবিলম্বে ‘জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠন এবং ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করছি। একই সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার জন্য জাতীয় সংসদে ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা অস্বীকার অপরাধ আইন’ দ্রুত পাশ করার দাবি জানাচ্ছি।’
ওয়েবিনারের প্রধান বক্তা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রচয়িতা ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সংবিধান ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সৃষ্টি এক রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক সংগ্রামের প্রেক্ষিতে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ তারিখ থেকে কার্যকর এবং এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক উক্তরূপ স্বাধীনতার ঘোষণা দৃঢ়ভাবে অনুমোদন ও সমর্থন করা হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর অস্থায়ী সংবিধান ঘোষণা করা হয়, যেখানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের স্বীকৃতি রয়েছে। একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সমর্থন ও স্বীকৃতি মিলে সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম বাক্যে এবং সংবিধানের ১৫০ (৩) অনুচ্ছেদে। যেখানে বলা হয়েছে “স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং তাহা আইন অনুযায়ী যথার্থভাবে প্রণীত, প্রযুক্ত ও কৃত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল”। সে কারণে ৮ম সংশোধনী মামলার রায়ে বিচারপতি জনাব বদরুল হায়দার চৌধুরী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র-কে বলেছেন “সংবিধান সৃষ্টিতত্ত্ব” এবং এ কারণে, আমাদের সংবিধান অনন্য সাধারণ।’
ধর্মঅবমাননার মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতারকৃত বিজ্ঞানের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল এবং কপালে টিপ পরার কারণে পুলিশ সদস্য কর্তৃক লাঞ্ছনার শিকার লতা সমাদ্দার প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বারবার আঘাত হেনে চলেছে। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির যে দূর্বৃত্তায়ন তা আমাদেরকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে প্রতিহত করতে হবে।’
নির্মূল কমিটির আইন সহায়ক কমিটির সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘পুলিশ কনস্টেবল ড. লতা সমাদ্দারকে লাঞ্ছিত করলেও তার কোনো সাজা হয়নি। প্রশাসনে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ঘাপটি মেরে বসে আছে। সরকারের উচিত রাজাকার আলবদরদের বংশধরদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা।’
হৃদয় মণ্ডলের প্রসঙ্গ তুলে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘প্রশাসন কীভাবে হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করল তা আমার বোধগম্য নয়। বোধ করি আমাকে পুনরায় আইন শিক্ষা নিতে হবে। হৃদয় মণ্ডলকে শুধু জামিন দিলেই চলবে নাÑ মামলা থেকে নাম প্রত্যাহার করে সসম্মানে তাকে নিজ দায়িত্বে পুনর্বহাল করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হিজাব পরায় ছাত্রীকে প্রহার করার মিথ্যা অভিযোগে নওগাঁয় এক স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়ানো হয়েছে। অথচ স্কুল ইউনিফর্ম পরে না আসার কারণে তিনি ছাত্রীদের লঘু শাস্তি দেন।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য ধর্মান্ধ মৌলবাদী, রাজাকারদের বংশধর, স্বাধীনতাবিরোধী, দেশবিরোধী চক্র চক্রান্ত করছে। এদের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। যেকোনো মূল্যে তাদের প্রতিহত করতে হবে।’
১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর-এর সভাপতি বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মুজিবনগর সরকারের ধারণা, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুমোদনের কপি অনুবাদে তার ভূমিকা অগ্রণী। স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র যে কয়টি দেশ প্রকাশ করেছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ১০ এপ্রিলের সে ঘোষণাপত্রের ধারাবাহিকতায়ই ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়।
‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল কেন তার দুটি কারণ আমি চিহ্নিত করি। প্রথমত, জনগণের জন্য সাম্য ও মর্যাদার ভিত্তিতে বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের জনগণের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনধারণের জন্য যা করা দরকার তার জন্য। আজকে ৫০ বছর পরও স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়ে যে মানা না মানার বিষয়টি এসেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি দাবি জানাচ্ছি, ১০ এপ্রিলকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করার।
‘সৌদি আরব যেখানে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে হাঁটছে, সেখানে বিএনপি-জামায়াত জোট পাকিস্তানের রূপরেখায় বাংলাদেশকে পরিচালনা করতে চায়। ক্ষমতার স্বার্থে তারা অন্ধ হয়ে গেছে।
‘সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায় রাষ্ট্রীয় ভূমিকা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। ড. লতা সমাদ্দারের ঘটনায় দোষীকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে তা খুবই কম। এর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া হৃদয় মণ্ডলের ঘটনায় শুধু জামিন নয় মামলা প্রত্যাহার করে তাকে সসম্মানে মুক্তি দিতে হবে। এ ব্যবস্থা না নিলে সাম্প্রদায়িক যে মানসিকতা সে জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না দোষীরা। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপস করছেÑ যা আমাদের জন্য বিব্রতকর। রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চেতনা বজায় রাখতে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।’
নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ‘ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ চিরজীবী হওয়ার একমাত্র ও সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুসরণ। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে এই চেতনাই সর্বাগ্রে পালন করতে আমরা বাধ্য। আমাদের নীতি ও আদর্শ থেকে এর চুল পরিমাণ ব্যত্যয় ঘটলে তার মাসুল দিতে হবে শতগুণ। এর চাক্ষুষ প্রমাণ এবং অবধারিত সত্য হলো জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়ার শাসনের সর্বাংশে ব্যর্থ ২১ বছর। পাকিস্তানের এই তিন বংশবদ ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ও তার রেখে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে শতভাগ ভূলুণ্ঠিত করেছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে দেশ আজ পরিণত হয়েছে উন্নতির রোল মডেলে’। টিপ পরায় ড. লতা সমাদ্দারকে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে তিনি টিপ পরে ওয়েবিনারে অংশগ্রহণ করেন।
শহীদ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ড. লতা সমাদ্দার ও হৃদয় মণ্ডলের ঘটনায় নিন্দা ও দোষীদের বিচার দাবি করি। অসাম্প্রদায়িক অবস্থান থেকে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যে কাজটি করছে তা তাদের একার দায়িত্ব নয়, সবাইকে এই আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনাকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রীসহ সাড়ে তিনশ সাংসদকে স্মারকলিপি দিতে হবে যাতে এ বিষয়ে ভবিষ্যতেও সরকার সজাগ থাকে। সরকার থেকে শুরু করে সবাইকে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আলোকে বাংলাদেশ পরিচালিত হলে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলোর কারণে আমাদেরকে বর্তমানে হতাশ হতে হত না। রাষ্ট্র, সরকার ও সরকারি দল যদি তাদের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শিক নীতি নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে না আসে তবে এ অবস্থা নিরসন হবে না। ২০১১ সাল থেকে অব্যাহতভাবে সাম্প্রদায়িকতার এই ঘটনাগুলো ঘটছে। যদি এভাবে বাংলাদেশ চলতে থাকে তবে সামনের বাংলাদেশকে আমরা তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের মত দেখব। সেই সাথে আমাদের মতাদর্শের সকল মানুষ বিপর্যয়ের মুখে পড়ব। জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য গঠনের মাধ্যমে সবাইকে একজোট হয়ে মাঠে নামতে হবে। আমরা আর ’৭৫-এর বিভীষিকা দেখতে চাই না।’
বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের উপর ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বীর বাঙালি বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে। অথচ আজ স্বাধীনতাবিরোধীচক্র বাংলাদেশকে ধর্মের ভিত্তিতে দু’ভাগে ভাগ করেছে নিজেদের ফায়দা হাসিল করার জন্য। আমরা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নাগরিক সংগঠনগুলো এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে প্রতিহত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এ সংগ্রামে যদি সরকারকে পাশে পাই তবে আমাদের শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে প্রতিহত করতে হলে আমাদের অবিলম্বে একটি জাতীয় সংলাপে বসতে হবে।’
নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ বলেন, ‘১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধান থেকেই এই দুটি বিষয় আমাদের সংবিধানের অন্তর্গত করা হয়েছে। আমাদের সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্র সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। সংবিধানের চতুর্থ তফসিলেও স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্র ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি হিসেবে চিহ্নিত করে সংবিধানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হচ্ছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ আছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হচ্ছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি। সুতরাং এই বিষয় নিয়ে বিতর্ক অর্থহীন ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যা সংবিধান লঙ্ঘনেরও শামিল’।
নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর যুগ্মসম্পাদক লেখক সাংবাদিক সাব্বির খান বলেন, ‘ধর্মান্ধতাকে পেছনে ফেলে আমরা ’৭১-এ বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছি অথচ সেই বাংলাদেশে আজ সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।’ তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অবিলম্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে পরিচালনা করার আহ্বান জানান।
নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল বলেন, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাব। আমরা যুদ্ধ করে এদেশ স্বাধীন করেছি। এদেশ হারবে না। বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য যেসব রাজনীতিবিদ অবদান রেখেছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।’







