ইসরায়েল ৩০ বছর ধরে চেষ্টা করার পর অবশেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সক্ষম হয়েছে আমেরিকাকে দিয়ে ইরানকে আক্রমণ করাতে। এই যুদ্ধ শুরু তো হয়েছে, তবে শেষ হবে কবে তা এখন কেউ বলতে পারবে না। একটা একটা করে দুটো রেড লাইন পার করেছে ইসরায়েল এই যুদ্ধে। প্রথমটা ছিলো আয়াতুল্লাহ খামেনেই-এর হত্যা, আর দ্বিতীয়টা তাদের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডের অবকাঠামোর উপর হামলা। এই দুটো হামলাই ইরানকে এমন জায়গায় ঠেলে দিয়েছে যেখানে তারা আর শুধু প্রতিরক্ষা করছে না, বরং যুদ্ধকে পুরো গাল্ফে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে তেল-গ্যাসের দাম বিশ্বব্যাপী ১৫-২০% বেড়ে গেছে, আর অর্থনৈতিক চাপ এখন আমেরিকা-ইসরায়েলের উপরই পড়ছে।
ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ড হামলা নিয়ে যা লিখেছে, তার মূল পয়েন্টগুলো সাথে আমার এনালাইসিস দিলাম:
– ট্রাম্প: ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনায় রেগে গিয়ে ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে হামলা করেছে।
নিজেরাই এই যুদ্ধ শুরু করেছে, হঠাৎ আবার রেগে যাওয়ার কি কারণ? নাকি নেতানিয়াহু আসলেই মারে গেছে, ইজরায়েল মারাত্মক চাপে আছে, কিংবা ইরানের আগের মিসাইল হামলায় তাদের আসলেই বড় ক্ষতি হয়েছে? তবে আমার মতে এটা শুধু রাগ নয়, বরং কৌশল। ইসরায়েল জানে যে সাউথ পার্স, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্যাস ফিল্ডের ইরান অংশে আঘাত করলে ইরানের অর্থনীতি এক ধাক্কায় ৩০-৪০% ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু এই হামলা করেই তারা ইরানকে “আরব দেশগুলোকে টার্গেট করার” সুযোগ করে দিল। ফলে যুদ্ধ এখন আর শুধু ইরান-ইসরায়েল নয়, পুরো গাল্ফের তেল-গ্যাস অবকাঠামো জড়িয়ে গেছে। এটাই ট্র্যাপের শুরু।
– ট্রাম্প: আমেরিকা এই হামলার কথা একদম জানত না।
এটা হতেই পারে না। এত বড় হামলার আগে ইসরায়েল অবশ্যই সেন্টকমের সাথে কথা বলে নিয়েছে। এখন কাতার আর সৌদির কাছে মুখ বাঁচাতে ট্রাম্প “জানত না” বলছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা নিজেরাই বলেছে যে হামলা “কো-অর্ডিনেটেড” ছিল। ট্রাম্প এখন দূরত্ব তৈরি করছে কারণ কাতারে আমেরিকার সবচেয়ে বড় এয়ারবেস আছে, আর সৌদি-ইউএইও চাপে পড়েছে। এটা আমেরিকার ক্রেডেবিলিটি একেবারে শূন্য করে দিয়েছে।
– ট্রাম্প: কাতার এতে কোনোভাবে জড়িত ছিল না, বা তারা কিছু জানত না।
সেটা আমরাও জানি। কাতার হামলার কথা জানলে আগেই হইচই লাগিয়ে দিতো, কারণ ইরানের সাউথ পার্স আর কাতারের নর্থ ফিল্ড একই ফিল্ড। এটা বরং ট্রাম্পের কূটনৈতিক চাল। কাতারকে “নির্দোষ” দেখিয়ে তিনি আরব দেশগুলোকে আশ্বস্ত করতে চাইছেন যে আমেরিকা এখনও তাদের পক্ষে। কিন্তু বাস্তবে এই ফিল্ডের এক পাশে আঘাত করলে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাতার এখন ইরানের সাথে ডিপ্লোম্যাটিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছে।
– ট্রাম্প: ইরান তারপর অন্যায়ভাবে কাতারের রাস লাফান এলএনজি গ্যাস প্ল্যান্টে হামলা করেছে।
ইরান গতকাল রিটালিয়েশনে রাস লাফানে মিসাইল মেরেছে। ব্যাপক আগুন লেগেছে, কাতারের বড় ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু কোনো হতাহতের খবর নেই। ইরানের আর কোনো অপশন ছিল না। তারা আগেই বলেছিল – আরব দেশগুলো যদি আমেরিকান বেস সরায় না, তাহলে সবাইকে নিয়ে ডুববে। এখন পর্যন্ত কোনো আরব দেশ বেস সরায়নি; বরং সৌদি-ইউএই-জর্ডান আমেরিকাকে বেস ব্যবহার করতে দিয়েছে। তাই ইরানের কৌশল: “ডুবলে সবাইকে নিয়ে ডুবব”। এতে তেলের দাম আরও বেড়েছে, ইউরোপ-এশিয়া চাপে পড়েছে।
ট্রাম্প: এখন থেকে ইসরায়েল এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাউথ পার্স ফিল্ডে আর কোনো হামলা করবে না।
শুধু সাউথ পার্স নয়, ইরানের কোনো তেল-গ্যাস অবকাঠামোতে আর হামলা করলে ইরান পাল্টা জিসিসি দেশগুলোর, যেমন সৌদি, ইউএই, কাতার, প্ল্যান্ট আর ইসরায়েলের নিজের তেল অবকাঠামোতে হামলা করবে। এটা ট্রাম্পের লাল লাইন – কিন্তু ইরান এখন এই লাইনকে নিজের সুবিধায় ব্যবহার করছে।
ট্রাম্প: তবে যদি ইরান কাতারের উপর আবার আক্রমণ করে, তাহলে আমেরিকা ইসরায়েলের সাহায্য নিয়ে বা না নিয়ে পুরো সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডকে এমন ভয়ঙ্কর শক্তিতে উড়িয়ে দেবে যা ইরান কখনো দেখেনি বা অনুভব করেনি।
এখানেই আমেরিকা ট্র্যাপে পড়েছে। ইসরায়েল আমেরিকাকে এই যুদ্ধে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। ট্রাম্পের মিলিটারি শক্তির নেশা এখন আমেরিকার অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে। পুরো ফিল্ড উড়িয়ে দিলে বিশ্বের গ্যাস সাপ্লাই ৮% কমে যাবে – যা ইউরোপ-চীনকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ট্রাম্পের ক্রেডেবিলিটি এখন শূন্যের কাছে। দুই দুইবার ইরানের সাথে নেগোসিয়েশনের মাঝে ইরানকে আক্রমণ করেছে ট্রাম্প। এবার তো ইসরায়েলের হামলার কথা “জানতাম না” বলে মিথ্যা বলছে, যদিও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছে হামলা কো-অর্ডিনেটেড ছিল। ফলে কাতার-সৌদি-ইউএই এখন আমেরিকাকে আর বিশ্বাস করছে না। পশ্চিমা দেশগুলো-ইউরোপ, ন্যাটো, ট্রাম্পের সাথে নেই – তারা হরমুজ প্রণালীতে সাহায্য করতে অস্বীকার করেছে, কারণ তারা চায় না ট্রাম্পের এই যুদ্ধে তেলের দাম আরও বাড়ুক আর অর্থনীতি ধসে যাক। ইউএন-এও কোনো সমর্থন নেই। এই মুহূর্তে আমেরিকা একা, আর এটাই ইরানের সবচেয়ে বড় জয়।
আজকের আরব-ইসলামিক ফরেন মিনিস্টারদের রিয়াদ মিটিং শেষে সৌদি ফরেন মিনিস্টার ফয়সাল বিন ফারহান স্পষ্ট করে বলেছেন: “ইরান এখনই তার আক্রমণ বন্ধ করুক, প্রতিবেশীদের সাথে ভালো ব্যবহার করুক। আমাদের ধৈর্যের সীমা আর নেই। দরকার হলে আমরা সামরিক জবাব দেব।” অন্য আরব দেশগুলোও ইরানের “হেইনাস অ্যাটাক” নিন্দা করেছে। এসব খুব শক্ত কথা, কিন্তু অস্ত্র তুলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার মতো নয়। আরব দেশগুলো ভয় পাচ্ছে যে যুদ্ধ আরও বাড়লে তাদের নিজেদের তেল-গ্যাস প্ল্যান্ট ধ্বংস হবে। তারা চায় কূটনীতি আর ইউএন-এর মাধ্যমে সমাধান। তারা সরাসরি অস্ত্র তুলবে না, তবে আমেরিকা-ইসরায়েলকে পেছন থেকে বেস, গোয়েন্দা তথ্য দিতে পারে। যা ইরানের উপর চাপ বাড়াবে, কিন্তু আমার মতে আরব দেশগুলো পুরো যুদ্ধে ঢোকার ঝুঁকি নেবে না।
আমেরিকা আর ইসরায়েল এখন যুদ্ধের যেই ট্র্যাপে পড়েছে, তাকে ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোর প্রফেসর রবার্ট পেপ বলেছেন “এসকেলেশন ট্র্যাপ”। এই ট্র্যাপে শক্তিশালী দেশ ভাবে “আরেকটু বোমা মারলেই যুদ্ধ শেষ হবে”, কিন্তু দুর্বল দেশ ইচ্ছা করেই সেই যুদ্ধকে লম্বা করে, ছড়িয়ে দেয়, যাতে শক্তিশালী দেশকে ক্লান্ত হয়ে যায়। আমেরিকা ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তান, এখন ইরান – যুদ্ধে এই একই ভুল বারবার করছে। প্রফেসর পেপ তার ফরেন অ্যাফেয়ার্স আর্টিকেলে লিখেছেন, “এসকেলেশন ইরানের পক্ষেই যাবে”। আর তার সাবস্ট্যাক “দ্য এসকেলেশন ট্র্যাপ”-এ বলেছেন, “ট্রাম্প যদি যুদ্ধ আরও বাড়ান, তাহলে আমেরিকাই নিজের ফাঁদেই আটকে যাবে।” ওনার শেষ কথা: যুদ্ধ এখনই ছোট করে শেষ করো, নইলে এটা ভিয়েতনামের মতো হয়ে যাবে। তিনি বলেছেন, “এখনও সময় আছে – কিন্তু দেরি হলে আর কিছু করার থাকবে না! শান্তি চাইলে এখনই কূটনীতির আশ্রয় নাও, নইলে যুদ্ধ আরও ভয়ঙ্কর হবে।”
ট্রাম্প যদিও চেষ্টা করছেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে, কিন্তু ইরানের “হাজার কাটায় মারা” কৌশল আর আরব দেশগুলোর চাপে এই যুদ্ধ এখন আমেরিকার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
Post Views: 267
Related