কলমে, মোহাম্মদ সোহেল:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার শিমরাইল গ্রামে সাংবাদিক দ্বীন ইসলামকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে নির্মম গণপিটুনিতে হত্যা করা হলো। সন্ত্রাসের কালো থাবা যেন বেছে নিলো একজন কণ্ঠস্বরকে, একজন সত্যের সৈনিককে। মঙ্গলবারের বিকেল যেন কালো অধ্যায় হয়ে আঁচড় কাটলো এই জনপদের ইতিহাসে।
দ্বীন ইসলাম। নামটির মধ্যে যেন প্রচ্ছন্ন ছিল এক মহৎ আহ্বান। শফিকুল ইসলামের এই তেজোদীপ্ত সন্তান দীর্ঘদিন ধরে কলমের মধ্য দিয়ে লড়ে চলেছিলেন মাদকের বিরুদ্ধে। তার লেখনী ছিল নির্ভীক, অবস্থান ছিল অনমনীয়। মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে তিনি ছাড় দেননি-এটাই হয়ে দাঁড়ালো তার অপরাধ, আর সেই অপরাধের মূল্য দিতে হলো জীবন দিয়ে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজনীন সুলতানা। তবে কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, রহস্যভেদ এখনো হয়নি। পুলিশ বলছে, তদন্ত চলছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-একজন সাংবাদিক কেন নিজ বাড়িতেও নিরাপদ নন? কেন তাকে কুমিল্লা শহরে ভাড়া বাড়িতে আশ্রয় নিতে হলো? ঈদের আনন্দে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে এসে কেনই বা ফিরে পেলেন মৃত্যুর নির্মম আলিঙ্গন? বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি আহমেদ আবু জাফর ও সাধারণ সম্পাদক লায়ন আবুল হোসেন গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এভাবে একজন সাংবাদিককে পিটিয়ে হত্যা করা যায় না। তাঁদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাঁরা আরও বলেছেন, দ্বীন ইসলামের সঙ্গে যাঁদের পূর্ব শত্রুতা ছিল, তাঁদের গ্রেফতার করলেই এই হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটিত হতে পারে। নিহত সাংবাদিকের অনলাইন পেইজ ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে অকুতোভয় প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন। তাঁর কলমে বারবার ধ্বনিত হয়েছে অসামাজিক এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রোষ। প্রশাসনের কিছু অংশ ও কতিপয় সাংবাদিকের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল তিক্ততায় ভরা। সত্যের পথে হাঁটতে গিয়ে একা হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু একা হলেও পিছপা হননি। নিরাপত্তার আশঙ্কায় কিছুদিন ধরে কুমিল্লায় বসবাস করছিলেন দ্বীন ইসলাম। ঈদুল ফিতরের আনন্দে নিজের বাড়ি ফিরেছিলেন। ফিরলেন, কিন্তু ফিরে পেলেন না প্রিয়জনদের ছোঁয়া, পেলেন না শান্তির নিশ্বাস। মঙ্গলবার বিকেলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। আর তারপরই নৃশংস গণপিটুনি। থেমে গেল এক সংগ্রামী জীবনের গল্প। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়। এটি একজন সাংবাদিকের উপর হামলা, এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর আঘাত, এটি সত্যের পথে হাঁটার শাস্তি। যেখানে সাংবাদিক নিজেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, সেখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা কেমন হয়,-এই প্রশ্ন আজ দেশের প্রতিটি সংবাদকর্মীকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসীরা আলো দেখতে পায় না। তাই তারা বেছে নেয় অন্ধকার। দ্বীন ইসলামের লেখনী ছিল সেই অন্ধকারে আলোর দিশারি। হয়তো তার কলমের আঘাতই সন্ত্রাসীদের দগদগে করেছিল। তাই তারা প্রতিশোধ নিলো। কিন্তু প্রতিশোধের এ আগুন কখনো নিভিয়ে দিতে পারবে না সত্যের পিপাসা।
কসবার নির্মোহ আলোয় আজ এক সাংবাদিকের নীরব বিদায়। তার মৃত্যু যেন প্রতিটি কলমের অক্ষরে হয়ে ওঠে অমর। হত্যাকারীরা যেখানেই থাকুক, আইনের কাঠগড়ায় তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনেরও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন-একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তার প্রশ্নে কেন তারা ব্যর্থ হলো? নিজ ঘরে এসে নিরাপত্তা ফিরে পাওয়ার বদলে মৃত্যু হলো যার, তার আত্মার শান্তি কামনা করি। আর যাঁরা কলম ধরেছেন সত্যের পথে, তাঁরা যেন এই ঘটনায় দমে না যান। কারণ কলমের কালি কখনো শুকায় না, যদি না থামিয়ে দেওয়া হয় তাকে ইচ্ছেমতো। যত দিন সত্যের পথে হাঁটবেন সাংবাদিকেরা, তত দিন নির্মম গণপিটুনিও প্রতিহত হবে সত্যের শক্তিতে। দ্বীন ইসলামের বিদেহী আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।







