যুদ্ধের আজ ২৮তম দিন। আমেরিকা ও ইরান দুই পক্ষই আরও কঠোর অবস্থানে পৌছেছে। সর্বশেষ অবস্থা হলো- আপাতত যুদ্ধবিরতির কোনও লক্ষ্মণ নাই। বলা যায়- যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরুর আগেই ভেঙে পড়েছে। ইরান ও আমেরিকা উভয়ই নিজেদের অবস্থান কঠিন করেছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে।
ইরান ক্রমান্বয়ে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে এবং কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে “টোল বুথ” বানিয়ে ফেলেছে। কিছু দেশের জ্বালানি তেলবাহী জাহাজকে যেতে দিলেও কিছু আটকাচ্ছে।ফলে- বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র হচ্ছে।
অন্যদিকে আমেরিকা ইরানের চারদিকে বড় সেনা সমাবেশ করছে। ইতিমধ্যে ২,৫০০ মেরিন সেনা, ১,০০০ প্যারাট্রুপারের পাশাপাশি ৫,০০০ বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্থলসেনা স্থল-যুদ্ধের জন্য মোতায়েন করছে। আমেরিকা বুঝতে পেরেছে- শুধু মিসাইল ও বোমা মেরে ইরানের সরকার পরিবর্তন করা যাবে না। তাই তারা স্থল-যুদ্ধের মাধ্যমেই ইরান দখল করে ইসলামি সরকারকে হটিয়ে আমেরিকার পছন্দের সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে চায়।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যে আমেরিকাকে জলে-স্থলে ব্যাপক সামরিক হামলা চালাতে হবে। আমেরিকা ও ইসরায়েল মিলে ইতিমধ্যে ইরানের অভ্যন্তরে ২২,০০০+ টার্গেটে হামলা করেছে এবং হামলা অব্যাহত রয়েছে। আমেরিকার টার্গেট হচ্ছে ইরানের বড় বড় নৌ-জাহাজ, মিসাইল/ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র, সামরিক স্থাপনা, এয়ার বেইস, ইলেক্ট্রিক প্লান্ট এবং তেল শোধনাগার।
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। ইসিরাইলের পাশাপাশি প্রতিবেশি ওমান, কাতার, ইউএই, জর্ডান, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক, সিরিয়া, সাইপ্রাস ও ৪০০০ কি:মি: দূরের দিয়াগো গার্সিয়া দ্বীপে মিসাইল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও আক্রান্ত হচ্ছে আমেরিকান নেভাল ফ্লিট ও এয়ারক্রাফট কেরিয়ার।
এমতাবস্থায়, যুদ্ধ থামার তো লক্ষ্মণ নাইই, বরং যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলো উদ্বিগ্ন। তারা চায় যুদ্ধ শেষ হোক, কিন্তু ইরান দুর্বল না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকুক। এইসব আরব দেশগুলোর এমন দ্বিচারিতার কারণেই মুলত: মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধান হচ্ছে না। ইসরাইলের সাথে আপোষ করে হলেও ইরানের উত্থানকে থামাতে মরিয়া এসব দেশ। বলা যায়- এই “আরবরা ইসরাইলের লাথি উষ্টা খেয়ে বাচতে রাজি, কিন্তু ইরানের ফুলের টোকাও তারা সহ্য করবে না”! এমন মোনাফেকি শুধু আরব দেশের শাসকদেরই মানায়।
Washington Post-এর আজকের বর্নানা অনুযায়ী- যুদ্ধ এখন ডেডলক। কারণ কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছেনা। ইরান কৌশলগতভাবে তেল রুট নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বকে চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে আমেরিকা যুদ্ধ আরো বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি বাড়ছে-বই-কমছে না।
The New York Times বলছে- আমেরিকা ও ইসরাইল শুরুতে আশা করেছিল- ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের ভিতরেই বড় ধরনের গনবিদ্রোহ (uprising) হবে। কিন্তু যুদ্ধের চার সপ্তাহ পার হলেও ইরানে সরকার পতনের বড় কোন গণঅভ্যুত্থান হয়নি। ইরান এখনও ইসলামি সরকারের নিয়ন্ত্রণেই আছে। অর্থাৎ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এখনও অর্জিত হয়নি।
যুদ্ধের লক্ষ্য-অর্জন নিয়ে যেমন অনিশ্চয়তা রয়েছে, ঠিক তেমনি আমেরিকার লক্ষ্যও পরিষ্কার নয়। পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস চাই? নাকি পুরো সরকারের পরিবর্তন? এই “অস্পষ্ট লক্ষ্য” যুদ্ধকে জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধের ২৮তম দিনে এসে আমেরিকা-ইসরাইল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও- কৌশলগতভাবে ইরান রয়েছে দু’পা এগিয়ে। ইরানের হাজারো সামরিক, বেসামরিক স্থাপনা ধবংস, ৪ হাজার মানুষ মরলেও ইরান কিন্তু ভেঙে পড়েনি। বরং ইরান যুদ্ধ না থামিয়ে, আগ্রাসী শক্তির কাছে মাথা না নুইয়ে অদম্য সাহস নিয়ে পরাশক্তিকে মোকাবেলা করে যাচ্ছে।
আমেরিকা-ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে “জিতেছে” মনে করলেও, আসলে আমেরিকা পরাজয়ের খুব কাছাকাছি এসে দাড়িয়েছে। পরিস্থিতি এখন এতটাই অনিশ্চিত ও জটিল যে, যেকোনও পক্ষের এক বা একাধিক ভুলের মাসুল হবে যুদ্ধের জয়-পরাজয়।
আমরা আশা করবো- ইরান এই অসম যুদ্ধে বিজয়ী হবে। মধ্যপ্রাচ্যের আরব ভূমি থেকে আমেরিকা এবং পশ্চিমাদের সকল সামরিক স্থাপনা উচ্ছেদ হবে, আরব দুনিয়ায় শান্তির সুবাতাশ বইবে এবং চিরদিনের জন্য শান্তির আবাসভূমি হিসাবে পরিগণিত হবে মধ্যপ্রাচ্য।
সেই সুখবরের অপেক্ষায় রইলাম।
Post Views: 137
Related