হাজীগঞ্জের একেবারে শেষ প্রান্তে, বাঁশঝাড় আর পুকুরের মাঝখানে ছোট্ট একটা টিনের ঘরে থাকতেন আব্দুল মজিদ চাচা। বয়স ৬৪। স্ত্রী মারা গেছেন আট বছর আগে। ছেলে-মেয়েরা সবাই শহরে, কেউ ঢাকায়, কেউ চট্টগ্রামে। চাচা একা। সকালে মসজিদ, দুপুরে ঘুম, বিকেলে পুকুরপাড়ে বসে চা, রাতে টিভিতে খবর আর সিরিয়াল। জীবনটা ছিল শান্ত, কিন্তু ফাঁকা।
একদিন ফেসবুকে একটা মেসেজ এলো।
নাম ফাতেমা রেজা। ইরানের মাশহাদের মেয়ে। বয়স ২৮। ছবিতে দেখা যায়—কালো চোখ, লম্বা চুল, হাসলে গালে টোল পড়ে। লিখেছে:
“আসসালামু আলাইকুম চাচা। আমি আপনার ছেলের বন্ধুর বোন। আমি বাংলাদেশে আসতে চাই। আমার দেশে এখন অনেক সমস্যা। আমি শুধু একটা নিরাপদ জায়গা চাই। আমি রান্না করতে পারি, ঘর সামলাতে পারি। আপনি যদি আমাকে বিয়ে করেন, আমি আপনার সঙ্গে থাকব।”
চাচা প্রথমে ভেবেছিলেন স্ক্যাম। কিন্তু মেয়েটা ভিডিও কলে এলো। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমার বাবা-মা মারা গেছেন। ভাইয়েরা জেলে। আমার কাছে কেউ নেই। আমি শুধু বেঁচে থাকতে চাই। আমি জানি আপনার বয়স হয়েছে। আমি আপনাকে বাবার মতো সম্মান করব। শুধু আমাকে একটা ছাদ দিন।”
চাচা অনেক ভেবেছেন। গ্রামের লোক কী বলবে? ছেলেমেয়েরা কী বলবে? কিন্তু রাতে যখন ঘরটা ফাঁকা লাগত, তখন মনে হতো—আর কয়টা দিনই বা বাঁচব? একটা মানুষের সঙ্গ থাকলে কী এত খারাপ?
শেষ পর্যন্ত হ্যাঁ বলে দিলেন।
ফাতেমা এলো তিন মাস পর। বিমানবন্দরে চাচা গিয়েছিলেন। ফাতেমা কালো হিজাব পরে, চোখে কাজল, হাতে একটা ছোট ব্যাগ। দেখা হতেই সে চাচার পা ছুঁয়ে সালাম করল। চাচা লজ্জা পেয়ে বললেন,
“আরে না না, এসব করতে হবে না। চলো বাড়ি যাই।”
গ্রামে পৌঁছে যা হওয়ার তাই হলো। লোকে বলাবলি করল,
“বুড়োটা টাকা দিয়ে বিদেশি মেয়ে কিনে এনেছে।”
“এই বয়সে লজ্জা-শরম নেই।”
“মেয়েটা নিশ্চয়ই কোনো ফাঁদে পড়েছে।”
কিন্তু ফাতেমা কারো কথায় কান দিত না। সকালে উঠে চাচার জন্য চা বানাত। ইরানি চা—দারচিনি, এলাচ আর কালো চা দিয়ে। চাচা খেয়ে বলতেন,
“এইটা তো জান্নাতের চা মনে হয়।”
ফাতেমা রান্না করত—চেলো কাবাব, ঘোরমে সাবজি, আর বাঙালি স্টাইলে ভাত-ডাল-মাছ। দুপুরে চাচা যখন ঘুমাতেন, ফাতেমা তার পাশে বসে থাকত। কখনো কুরআন পড়ত, কখনো বাংলা শিখত।
একদিন সন্ধ্যায় চাচা জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার খারাপ লাগে না? এই গ্রাম, এই ঘর, আমার মতো বুড়ো মানুষ?”
ফাতেমা হেসে বলল,
“চাচা, আমার দেশে এখন বোমা পড়ে। এখানে শান্তি আছে। আপনি আমাকে চিৎকার করে না, মারেন না, বকেন না। আপনি আমার দিকে এমনভাবে তাকান যেন আমি কোনো মূল্যবান জিনিস। এটা আমার কাছে অনেক বড়।”
চাচা চুপ করে গেলেন। তারপর বললেন,
“আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। যদি কখনো মনে হয় তুমি চলে যেতে চাও—আমি তোমাকে আটকাব না।”
ফাতেমা মাথা নেড়ে বলল,
“আমি যাব না। আমি এখানেই থাকব। আপনার সাথে।”
সেই থেকে গ্রামের লোকের কথা কমে গেল। কারণ তারা দেখতে পেল—সকালে ফাতেমা চাচার জন্য চা নিয়ে আসে, চাচা হাসেন। বিকেলে দুজনে পুকুরপাড়ে বসে গল্প করেন। ফাতেমা বাংলা গান শেখে, চাচা আরবি আয়াত শোনান।
এক বছর পর গ্রামের লোক আর “বুড়োর বিদেশি বউ” বলে না। বলে,
“আব্দুল মজিদ চাচার বাড়িতে আবার হাসি ফিরেছে।”
আর চাচা? তিনি রাতে যখন ঘুমাতে যান, ফাতেমা তার পাশে শুয়ে থাকে। চাচা বলেন,
“আল্লাহ তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন। আমি আর একা নই।”
ফাতেমা চুপ করে হাসে। আর মনে মনে বলে,
“আমিও আর একা নই।”








