১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ তখন ছিল প্রবলভাবে আত্মবিশ্বাসী—অনেকে বলবে, ওভারকনফিডেন্ট। মাঠের চিত্র, জনসমর্থন আর দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে আওয়ামী লীগের ধারণা ছিল, এই নির্বাচন হারার প্রশ্নই আসে না। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপির বহু সমর্থকও মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে পারেননি যে ওই নির্বাচনে সত্যিকার অর্থে বিএনপি জয়ী হয়েছে। এটি আওয়ামী লীগের কৌশলগত ও প্রচারণাগত ব্যর্থতা ছিল, নাকি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—সে বিতর্ক আলাদা, সেটি ভিন্ন আলোচনার বিষয়।
নির্বাচনের পরপরই আওয়ামী লীগের ভেতরে শুরু হয় নেতৃত্বকে ঘিরে অস্থিরতা। পরাজয়ের দায় কাকে বহন করতে হবে—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে একটি গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেই গোষ্ঠীর মুখ্য চরিত্র ছিলেন ড. কামাল হোসেন। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তিনি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের কার্যত প্রধান ছিলেন, এমনকি জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিলেন। ফলে দলের নেতৃত্ব ফিরে পাওয়ার ব্যক্তিগত বাসনা তাঁর রাজনীতিতে নতুন কিছু ছিল না।
১৯৯১ সালের নির্বাচনী পরাজয়কে অজুহাত বানিয়ে ড. কামাল হোসেন প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করেন। যুক্তি হিসেবে তিনি পশ্চিমা গণতন্ত্রের উদাহরণ হাজির করেন—সেখানে নাকি নির্বাচনে হারলে দলীয় প্রধান বদলে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সচেতনভাবেই উপেক্ষা করেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আওয়ামী লীগের ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার বহনকারী নেতৃত্বের গুরুত্ব।
শেখ হাসিনা তখন আবেগী হলেও দায়িত্বজ্ঞানহীন ছিলেন না। দলের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। কিন্তু এখানেই ইতিহাস ভিন্ন মোড় নেয়। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মী, ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসে। তারা শেখ হাসিনার বাসভবনের সামনে অবস্থান নেয়—একটাই দাবি, পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করতে হবে।
এই আন্দোলন কোনো ক্ষমতার লোভ থেকে নয়, কোনো পদ-পদবির আশায় নয়—ছিল নিখাদ ভালোবাসা, আস্থা আর বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির প্রতি দায়বদ্ধতা। বিশ্বাসঘাতকতার এই যুগে একজন পদত্যাগকারী নেতার প্রতি এমন অকুণ্ঠ সমর্থন ও ত্যাগী ভালোবাসার উদাহরণ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
চাপের কাছে নয়, কর্মীদের ভালোবাসার কাছেই ফিরে আসেন শেখ হাসিনা। তিনি আবার নেতৃত্ব নেন, রাজপথে নামেন, গণআন্দোলন সংগঠিত করেন। সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে। ধাপে ধাপে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর পর সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে—যিনি শুধু রাষ্ট্র পরিচালনাই করেননি, বরং আওয়ামী লীগকে আদর্শিক ও সাংগঠনিকভাবে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
এই কারণেই শেখ হাসিনা রাজনীতি করবেন কি করবেন না—এই সিদ্ধান্ত এককভাবে তাঁর নিজেরও নয়। এই সিদ্ধান্ত নেবে এ দেশের শোষিত-বঞ্চিত মানুষ, নেবে আওয়ামী লীগের সেই তৃণমূলের কর্মীরা—যারা বিন্দুমাত্র ব্যক্তিগত লাভের আশা না রেখে, দিনের পর দিন দলের প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনা কোনো সাময়িক রাজনৈতিক ঘটনা নন। তিনি একটি সংগ্রামের নাম, একটি ধারাবাহিকতার প্রতীক। আর সেই ধারাবাহিকতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে জনগণ ও ত্যাগী কর্মীরাই—ইতিহাস যেমন বারবার তা প্রমাণ করেছে।
সোহেল হওলাদার








