ব্যবহারের সৌন্দর্যই স্থায়ী
একজনের সাথে অন্যজনের দেখা হলে কুশল বিনিময় করে, দূরে থাকলে ফোনে-মেসেজে খোঁজ খবর রাখে। দীর্ঘদিন দেখাদেখি বন্ধ থাকলে, যোগাযোগ না রাখলে স্মৃতিতেও ধুলো জমে। বলা হয়ে থাকে, চোখের আড়াল তো মনেরও আড়াল। অথচ মানুষ ইচ্ছা করলে নিজের একটি হুবহু কপি অন্যের হৃদয়ে জমা রাখতে পারে। এই রূপটার স্থায়িত্ব এতোটাই দৃঢ় ও সতেজ হতে পারে যাতে বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া মানুষও অবিকল মনের ঘরে থাকে। ভাবছেন, এটা কেমনে সম্ভব? সম্ভব, সহজেই সম্ভব। মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করলেই সম্ভব। মানুষের সাথে হাসিমুখে সুন্দর করে কথা বললেই সম্ভব। মানুষের উপকার করলেই সম্ভব। কারো কোনো ক্ষতি না করলেই সম্ভব। কাউকে কষ্ট-ব্যথা না দিলেই সম্ভব। কারো নামে নিন্দা বা বদনাম না রটালেই সম্ভব।
কারো জন্যে উপকারী ও নিরাপদ হলে নিজের একটা ছায়া লিপি অন্যের সাথে সাথে ঘুরে। একান্ত নিরালে ভাবনার গহীনে তখন মানুষের হৃদয়ের গভীরে মানুষের কপি জেগে ওঠে। সামনে থাকার অভিজ্ঞতার থেকেও, চোখে দেখার অনুভূতির চেয়েও কিংবা জীবন্ত স্পর্শের অনুরণনের থেকেও সেটা আরও জোরালোভাবে কিংবদন্তির রূপ লাভ করে। বিপদের দিনে কারো পাশে দাঁড়ালে, দুর্দিনে কারো ভরসা হলে কিংবা প্রয়োজনে কাউকে সাহায্য করলে মন থেকে মৃত্যুর আগে সে হারায় না। যুগ-যুগান্তর জুড়ে সেই মানুষের স্মৃতিকে বয়ে বেড়াতে হয় যে বিশ্বাসের কদর করেছিল। খুব কম মানুষই অকৃতজ্ঞ হতে পারে।
অদেখা অনেক মানুষই আমাদের হৃদয়ে বাস করে। এটা কেন এবং কীভাবে সম্ভব? তাদের কথা ও কর্মের পুরস্কার স্বরূপ। কত মহামানবেরমহানুভবতা স্মরণ করে আজও আমরা বিনীত হই। অথচ পৃথিবীর মানচিত্র থেকে তাদের কারো কারো হারিয়ে যাওয়ার বয়স হাজার বছরেরও বেশি। অথচ কত মানুষ আমাদের চোখের সামনে ঘুরে, পাশে বসে, কথা বলে তবুও আমাদের হৃদয়ে ঠাঁই পায় না। কেন? সংসার সমাজের জন্য তারা উপকারী নয়। ক্ষমতাকেই যারা চিরস্থায়ী শক্তি ভাবে। সম্পদকে যারা মুক্তির মাধ্যম মনে করে তারা আসলে সাময়িক থাকলেও চিরকাল জুড়ে থাকে না। যে ঠকায়, যারা ব্যথা দেয় তারা চোখের আড়াল হওয়ার আগেই মনের আড়াল হয়ে যায়। অথচ সেই মানুষটি মনের মধ্যে সবার আগে আসন পেতে বসেছে যার সাথে আমার এখনো দেখা হয়নি কিংবা কখনোই দেখা নাও হতে পারে।
কেন কাছে থেকেও মানুষ পর হয় আবার দূরে থেকেও কেউ কেউ আপন হয়? ব্যবহারে। একটি তীর্যক কথা, সামান্য অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে কারো কারো জন্য হৃদয়ের দরজা ধপাস ধপাস করে বন্ধ হয়ে যায়। এদের কেউ কেউ ভুল ইচ্ছা করেও করে। অথচ কারো কারো সাথে জীবনের কোনো লেনাদেনা নাই কিন্তু তাদের মাহাত্ম্যকথা শুনে হৃদয় বিগলিত হয়ে তাদেরকে শ্রদ্ধার আসনে বসায়। রোজ আমাদের সাথে যাদের যোগাযোগ হয়ে সে-সবের অনেকটাই প্রয়োজনের। সামান্য যে-কজন শুধু নিঃস্বার্থ খবর রাখে সে-কজনের আসন হৃদয়ের মধ্যে সবার ঊর্ধ্বে। কারো একটি কথায়, কারো একটু যত্নে মানুষ মরণের দরজা থেকেও ফেরত আসতে পারে। অনেক মন্দের মধ্যেও যতটুকু ভালো সেইটুকুর ক্ষুধাতেই মানুষ বাঁচার আশা লালন করে। স্বপ্ন দেখে সুদিনের। পাড়ি দেয় সংকট। লড়াই করে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি। ভাবে, এই বুঝি ভোরের সুবাতাসবয়ে যাবে জীবনে।
সদিচ্ছা থাকলেই মানুষ মানুষের সাথে ভালো আচরণ করতে পারে। ভালো কথা বলতে তো পয়সা খরচ হয় না। একটু ভালো ব্যবহার মানুষের মূল্যকে যে কতটা বৃদ্ধি করতে পারে তা অনেকেই জানে না। সাধ্যমতো উপকার করা, সৎ পরামর্শ দেওয়া কিংবা বিপদে ভরসা হওয়া- মানবীয় মহৎগুণ। আমরা যেন ভালোর আলো অনুসরণের ব্যাপারে কৃপণতা না করি। মানুষের আসল সৌন্দর্য শরীরে নয় বরং আচরণে- এই সহজ সত্য যেন কখনোই বিস্মৃত না হই। চেহারার সৌন্দর্য মলিন হয়, লাবণ্য নষ্ট হয় কিন্তু ব্যবহারের সৌন্দর্য পৃথিবীর চারদিকে সুঘ্রাণ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের জন্য নিরাপদ হওয়ার চেয়ে ভালো কোনো অর্জন নাই। একটা আমি’রউৎকৃষ্ট রূপ যদি অন্যদের কাছে জমা রাখতে পারি তবে সেটাই ছোট্ট জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা। আমার হাত ও মুখ দ্বারা যেন সবাই নিরাপদ থাকে।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।








