মানবাধিকার সংগঠন ‘নাগরিক উদ্যোগ’ ও ‘বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম)’ এর যৌথ আয়োজনে দলিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান ও পরিচিত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ ১১ এপ্রিল ২০২৬ (শনিবার) সকাল ১০.৩০ এ অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন নাগরিক উদ্যোগ এর প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন।
বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ, লেখক ও গবেষক মাজহারুল ইসলাম, নাগরিক উদ্যোগ এর নির্বাহী কমিটির সদস্য মেইনথিন প্রমীলা, দলিত নারী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মণি রানী দাস, বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম)-কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি উত্তম কুমার ভক্ত, সাধারণ সম্পাদক শিপন কুমার রবিদাস, শিক্ষা ও সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক তাপস রাজবংশী।
নাগরিক উদ্যোগ এর ক্যাম্পেইন কো-অর্ডিনেটর ইসতিয়াক মাহমুদ এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে বৃত্তিপ্রাপ্ত ৪০ জন শিক্ষার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেন নাগরিক উদ্যোগ এর কর্মসূচি ব্যবস্থাপক নাদিরা পারভীন। তাদের প্রত্যেককে এবছরের প্রথম ০৩ মাস (জানুয়ারী-মার্চ) এর বৃত্তির চেক, অভিনন্দনপত্র এবং সনদ প্রদান করা হয়। এরপর বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে অনুভূতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন দলিত ও আদিবাসী শিক্ষার্থী সৌরভ অলমিক, বর্ণালী বিশ^াস, প্রত্যাশা নকরেক, শোয়েতা রানী দাস, তিথী রানী দাস ও মৌমিতা রানী। অভিভাবকদের মধ্য থেকে বক্তব্য রাখেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার সুভাষ রবিদাস। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে জামিল-সারোয়ার ট্রাস্ট এর মরহুমা সারোয়ার মোর্শেদ খান এর মৃত্যুতে তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
বক্তব্য প্রদানকালে নাগরিক উদ্যোগ এর প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, “বিপুল সংখ্যক দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে ৪০ জনকে সুযোগ দেওয়া সংখ্যার বিবেচনায় কম মনে হলেও এটি অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকগুলো আবেদনের মাঝে আমরা চুড়ান্ত নির্বাচনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি প্রান্তিক ও দারিদ্রতার পাশাপাশি শিক্ষাগ্রহণে চাহিদার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছি। আসলে সমাজের উন্নতি করতে হলে আবশ্যিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে। দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার হার বাড়াতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা সহায়তা কেন্দ্র এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে নাগরিক উদ্যোগ সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছে। নাগরিক উদ্যোগ ও বিডিইআরএম এর দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল হিসেবে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলিত-হরিজন শিক্ষার্থীদের জন্য ১% কোটার সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু নানা কারণে সে পরিমাণ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার মতো যোগ্য হয়ে উঠতে পারছে না।”
বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ বলেন, “আমি মনে করি আজ যারা এখানে এসেছেন, তারা প্রত্যেকেই বিপ্লবী। সমাজ পরিবর্তণের বিপ্লবী। কেননা, দলিত কলোনী ও এলাকাগুলোতে পড়াশোনার যথোপযুক্ত পরিবেশ থাকেনা, ফলে এটি বিপ্লবের চেয়ে কম নয়। কেউ আসলে পিছিয়ে পড়া হিসেবে জন্ম নেয় না। নানা প্রতিকূলতার দরুন তারা পিছিয়ে পড়ে। ফলে তাদের ‘পিছিয়ে পড়া’ নয় ‘পিছিয়ে ফেলা’ হিসেবে বিবেচনা করাই সঠিক হবে বলে মনে করি। রাষ্ট্র মূলত সচেতনভাবেই বৈষম্য জিইয়ে রেখেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এ থেকে উত্তোরণের জন্য নিজ জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করতে হবে। বাবাসাহেব আম্বেদকর তা-ই করেছেন।”
নাগরিক উদ্যোগ এর নির্বাহী কমিটির সদস্য মেইনথিন প্রমীলা বলেন, “এটি বৃত্তি নয়, স্বীকৃতি। তথাকথিত স্রোতের বাইরে গিয়ে নাগরিক উদ্যোগ সমাজের পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে যে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছে, তা প্রশংসনীয়। দলিত ও আদিবাসী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে পেরে আমরাই সম্মানিত বোধ করছি।”
লেখক ও গবেষক মাজহারুল ইসলাম বলেন, “দলিত পরিবারের হওয়ার কারণে অনেককে তাঁদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয়নি। তাদের মধ্যে বিনোদ কামলা, বালো’র নাম উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন সময়ে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ অর্জন থাকলেও কেবলমাত্র অস্পৃশ্যতার অজুহাতে বালোকে অধিনায়কত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে সামাজিক, রাজনৈতিক বঞ্চনার পাশাপাশি ক্রীড়াতেও দলিততের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শনের নজির লক্ষ্য করা যায়। এই বৈষম্যের জাল ছিন্ন করতে একালের দলিত শিক্ষার্থীদের হাল ধরতে হবে।”
বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা অনুভূতি প্রকাশকালে বলেন, “আমরা অনেক কষ্টে এতদূর আসতে পেরেছি। পরিবারের অভাব অনটনসহ নানাবিধ প্রতিকূলতা পেরিয়ে এপর্যায়ে এসে শিক্ষাগ্রহণ অব্যহত রাখতে নাগরিক উদ্যোগ ও বিডিইআরএম এর এ শিক্ষাবৃত্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আশা করছি বৃত্তিপ্রাপ্ত অর্থে আমরা আমাদের পড়াশোনাকে আরও এগিয়ে নিতে পারবো এবং সম্ভব হলে পরিবারকেও কিছুটা সহায়তা করতে পারবো।”







