প্রবাসে থেকেও দেশের জমি বিক্রি, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনা করবেন কীভাবে? পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি বা ক্ষমতাপত্রের ‘এ টু জেড’ আইনি গাইডলাইন!
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
অনেকে বিদেশে অবস্থান করছেন, ইচ্ছে করলেই দেশে আসতে পারেন না। কিন্তু বিদেশে বসেই দেশে থাকা জমি ক্রয়-বিক্রয়, দেখাশোনার দায়িত্ব কিংবা আপনার পক্ষে মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনা, ব্যাংক লোন নেয়া বিশেষ জরুরী হয়ে পড়েছে। নো টেনশন! প্রয়োজনীয় এসব কাজ সম্পাদনের জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় আপনি বিশ্বস্থ কারও উপর পাওয়ার অব এ্যাটর্নি দলিল সম্পাদন অর্থাৎ ক্ষমতাপত্র দিতে পারেন। তিনি আপনার পক্ষে আপনার প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পাদন করতে পারেন।
আপনি যে কাজটি করতে চান, সেই কাজের জন্য প্রথমে একটি পাওয়ার অব এ্যাটর্নী বা আমমোক্তারনামা বা ক্ষমতাপত্র দলিল তৈরী করুন। এটি সাদা কাগজেই লিখতে পারবেন। নিজে না পারলে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিয়ে নিতে পারেন। তিনি ড্রাফট প্রস্তুত করে আপনাকে ইমেইল কিংবা কুরিয়াতে পাঠিয়ে দিতে পারেন। উক্ত ড্রাফট পেপারের উপর অবশ্যই আপনার পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং যাকে ক্ষমতাপত্র দিচ্ছেন তারও একটি ছবি সংযুক্ত থাকতে হবে। সাথে উভয়েরই আইডি কার্ড ক্ষেত্রমতে আপনার পাসপোর্ট, ভিসাও সংযুক্ত করা যেতে পারে। অনেক সময় আয়কর সার্টিফিকেটও চাইতে পারে। জমির পাওয়ার অব এ্যাটর্নীর ক্ষেত্রে উক্ত জমির হালনাগাদ কাগজপত্র যেমন দলিল, মিউটেশন, পরচা, খাজনার দাখিলা ইত্যাদিও সংযুক্ত করা লাগতে পারে।
এরপর ড্রাফটি নিয়ে সোজা চলে যান আপনি যে দেশে বসবাস করছেন, উক্ত দেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসে। সেখানে গিয়ে জমা দিন। সেখানে বাংলাদেশের দূতাবাসের কনস্যুলারের সম্মুখে আপনি স্বাক্ষর করবেন এবং উক্ত কনস্যুলার কর্তৃক তা সত্যায়িত হবার পর আপনি যার উপর ক্ষমতা দিয়েছেন বাংলাদেশে আপনার সেই ভাই, বোন কিংবা বিশ^স্থ ব্যক্তির বরাবর পাঠিয়ে দিন। তিনি ড্রাফটি হাতে পাওয়ার সোজা চলে যাবেন বাংলাদেশের ফরেন মিনিষ্ট্রি (পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়) এর দপ্তরে। সেখানে গিয়ে সত্যায়নের জন্য জমা দেবেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সহকারী সচিব, কনস্যুলার সেটা যাচাই বাচাই কওে সত্যায়ন করে দেবেন। এ কাজটি সম্পাদনের জন্য ক্ষেত্রমতে ৭ থেকে ১০ দিন কিংবা আরো বেশী লাগতে পারে। সত্যায়নের কাজটি হয়ে গেলে সোজা চলে যাবেন আপনার জেলার ডিসি মহোদয়ের কার্যালয়ে। সেখানে গিয়ে একটি আবেদন লিখে আবেদনের উপর ২০ টাকা কোর্ট ফিস লাগিয়ে ই-সেবা কেন্দ্রে জমা দিন। তবে অবশ্যই সিল স্বাক্ষরযুক্ত একটি রিসিভ কপি করে নিবেন। যাতে জেলা প্রশাসন থেকে কোনভাবে হারিয়ে না যায়।
এরপর জেলা প্রশাসক স্বাক্ষর করে পাঠিয়ে দেবেন এডিসি (রেভিনিউ) কার্যালয়ে। তিনি আবার নোট দিয়ে আপনার বিদেশে সম্পাদিত আম-মোক্তার নামা দলিলে বর্ণিত সম্পত্তিতে সরকারী স্বার্থ জড়িত আছে কিনা তার তথ্যসহ সকল দাগের তথ্য সম্বলিত প্রতিবেদন প্রেরণ করতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর চিঠি প্রেরণ করবেন। সেই সাথে ড্রাফটের সত্যতা যাচাইয়ের আরেকটি চিঠি প্রেরণ করবেন সহকারী সচিব (কনস্যুলার) পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় বরাবর। সকল তথ্যসমগ্র জেলা প্রশাসকের রাজস্ব কার্যালয়ে আসার পর ২,০০০/- টাকার চালান প্রদানের পর নিদিষ্ট একটি সময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এতে ৫০০ এবং অপর পাতায় ৫০০ টাকার দুটি আঠালো স্ট্যাম্প লাগাবে। এসব করতে ন্যূনতম ১৫ দিন কিংবা তার চেয়েও বেশী সময় লাগতে পারে। অত্র পাওয়ার অব এ্যাটর্নির দলিল নম্বর পড়বে। এরপর জমি বিক্রি, রেজিস্ট্রির প্রয়োজন হলে সোজা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে জমা দিলে কাজটি হয়ে যাবে। তবে আনন্দের সংবাদ এই যে, জমি রেজিস্ট্রেশন এ্যাক্ট সংশোধণের পর এ পাওয়ার অব এ্যাটর্নী ড্রাফটের মেয়াদ বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ মাস। এই ৬ মাসের মধ্যে আপনার কাজগুলি সম্পাদন করতে হবে। এটি রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ এর ধারা ৮৯ এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংশ্লিষ্ট সাব রেজিস্ট্রার ১নং বহিতে নথিভূক্ত করে সংরক্ষনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
অনেকেই মনে করেন পাওয়ার অব এ্যাটর্নি একবার দিয়ে দিলে তা আর বাতিল করা যায় না। তবে এটি একটি ভুল ধারনা। আপনি চাইলেই এটার অবসান করতে পারবেন। যার উপর ক্ষমতা দিয়েছেন সেই গ্রহীতাকে আপনি রেজিস্ট্রার্ড ডাকের মাধ্যমে ৩০ দিনের নোটিশ প্রদানপূর্বক প্রদত্ত ক্ষমতার অবসান ঘটাতে পারবেন। আবার পাওয়ার গ্রহীতাও পাওয়ার দাতাকে ৩০ দিনের নোটিশ প্রদানপূর্বক পাওয়ার অব এ্যাটর্নির দায়িত্ব পরিত্যাগ করতে পারবেন। এই বিধানগুলো পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এর ধারা ১১-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখিত।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।
Post Views: 159
Related