ব্যাংক রেজল্যুশন আইন যেভাবে পাশ হয়েছে সংসদে, এতে বড় ধরনের এক ফাঁক রয়েছে। সরকার ব্যাংকের গ্রাহকদের ‘টাকা লুটপাটকারী ব্যবসায়ী’দের টোপ দিতে ফোঁকর তৈরি করে উলটো সরকারই তাদের চালে জালবন্দী হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
সহজভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে বলি। সংশোধিত আইনে ১৮(ক) ধারার মাধ্যমে একীভূত হওয়া অর্থাৎ ‘রেজল্যুশন’ প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোর পুরোনো মালিকদের পুনরায় মালিকানা ফিরে পাবার আইনি পথ তৈরি করা হয়েছে; আইনে অস্পষ্ট সংজ্ঞা রেখে।
বলা হয়েছে, একীভূত হওয়া বা একীভূতকরণের তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকরা অথবা পরিচালকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগ করা অর্থের ৭.৫ শতাংশ পে করে মালিকানা ফিরে পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন।
বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সরল সুদে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
এখানে ফোঁকরটা হলো সাড়ে ৭ শতাংশ পে করা হয়ে গেলে তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে ব্যাংক, এরপর দুই বছরের মধ্যে বাকি সব টাকা পরিশোধ করবে? নাকি দুই বছরেই সব দায় পরিশোধের পর তারা মালিকানা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে পাবেন?
এখানেও প্রশ্ন, পুরোনো মালিকদের হাতে আবার রুগ্ন এসব ব্যাংক গেলে, এরা যে নিয়মকানুন মেনে পরিচালনা করবেন তার নিশ্চয়তা কী?
একবার যেভাবে গ্রাহকেরা প্রতারিত হয়েছেন, সেই তাদেরই ফিরিয়ে আনার আইনি সুযোগ রাখা মানে খাল কেটে কুমির আনা নয় কী?
সরকারের অর্থমন্ত্রী দেখলাম লজিক দিচ্ছেন, এই সম্মিলিত ৫টি ব্যাংকের জন্য অলরেডি ৮০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিছে, সামনে আরো দেড় লাখ কোটি টাকা দিতে হবে।
এভাবে আর কতদিনই বোঝা টানবে! সো, সরকার এখানে একটা বিকল্প উইন্ডো খোলা রাখতেছে, পুরোনো মালিকরা চাইলে ফিরতে পারবেন, তবে সব দায় পরিশোধ করার পর।
কিন্তু কথা হলো, সব দায় পরিশোধ করে ফিরবেন বলেছেন, আবার অস্পষ্ট আইনি ধারাটিতে রেখেছেন সাড়ে ৭ শতাংশ টাকা পে করেই আবেদন করতে পারবে উল্লেখ করে।
ব্যাপারটা এরকম ঘটবে নয় কী, তারা সাড়ে ৭ শতাংশ টাকা পে করে মালিকানা ফিরিয়ে নিবেন, তারপরই সব গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে নিজের লোক সেটআপ করে দিবেন, ২ বছরে যে টাকা পরিশোধ করার কথা, সেটা নানা তালবাহানা মাধ্যমে এড়িয়ে যাবেন, আর এ সময়ে লুটেপুটে নিয়ে যাবে ব্যাংকের ঝুলিতে অবশিষ্ট যা আছে।
এই ফাঁকটা বুঝতে পেরেই বিলটি যাচাই-বাছাই করতে ১০ সদস্যের যে কমিটি হয়েছিল, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য এই ধারাটির নিয়ে ভেটো দিছে। ইনক্লুডিং বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে এ ধারা অন্তর্ভুক্তিকে প্রব্লেম্যাটিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেখানে কীভাবে এটি রেখে চুড়ান্ত বিল আকারে প্রেজেন্ট করা হয়!
মন্ত্রীর ওপরে কোনো অদৃশ্য ছায়ামন্ত্রী আছেন, যিনি/যাহারা কাঁঠাল ভেঙে খেতে চাচ্ছেন? ১৮(ক) এ ধারাতে একচুয়েলি বেনিফিশিয়ারি করা হবেন, সেটা বুঝতে পারলে ধারণা করা সম্ভব, এর ডালপালা যে মেলা দূর।
সম্মিলিত ৫টি ব্যাংকের মধ্যে ৪টিই এস আলমের নিয়ন্ত্রিত; এবং বাকি ১টি নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলামের নিয়ন্ত্রিত।
দু’জনেই টাকা পাচারকারী। নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুটপাট করেছেন আওয়ামী দুঃশাসনকালে।
তিন মহাদেশে এক ‘এসআলমই পাচার করেছেন ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা’। আবার এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান এ নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও প্রায় ৭৮১ কোটি টাকা অবৈধ সম্পত্তির মামলা চলমান।
এক সপ্তাহ আগে সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ১০টি দেশ চিহ্নিত করা হয়েছে যেখানে গত সাড়ে ১৫ বছরে দেশের টাকা পাচার করা হয়েছে। সরকার ওইসব দেশের সঙ্গে তথ্য বিনিময়, পারস্পরিক সমঝোতা ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাচারকৃত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে। অলরেডি ৩টি দেশের সঙ্গে চুক্তি সেরেছেন।
যেখানে পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনতে দৌড়ঝাঁপ করছে, সেখানে টাকা পাচারকারী রাঘববোয়াল ব্যাংক লুটেরাদের জন্য আইনি ফাঁক রেখে আবারো লুটপাটের ফোঁকর তৈরি করে দেওয়াটা, খাল কেটে কুমির আনা!
Post Views: 183
Related