সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) নিবন্ধনবিহীন অনলাইন নিউজ পোর্টাল থেকে প্রকাশিত সংবাদ অপসারণে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে এসব পোর্টালের কোনো সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ, শেয়ার, লাইক বা কমেন্ট না করার জন্যও নাগরিকদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বুধবার বিকেলে এসএমপি কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম জানান, পুলিশ কমিশনারের ক্ষমতাবলে এই গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, এটি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কোনো সরাসরি নির্দেশনা নয়; বরং ২০২১ সালে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনার আলোকে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অনলাইন পোর্টালের নিবন্ধন বা বাতিলের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার হলেও আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে পুলিশের দায়িত্ব অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১৭ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী অনলাইন নিউজ পোর্টাল পরিচালনার জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। কিন্তু কিছু পোর্টাল নিবন্ধন ছাড়া ভুয়া, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
এ অবস্থায় নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ মে ২০২৬ সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে নিবন্ধনহীন সব অনলাইন নিউজ পোর্টাল দেশি-বিদেশি ডোমেইন থেকে সরিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা মানা না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।
তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবাদিক মহলে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন এবং এ ক্ষেত্রে পুলিশের সরাসরি এমন নির্দেশনা দেওয়ার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তপন কুমার সাহা বলেন, “গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নীতিমালা রক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। এখানে অন্য কোনো সংস্থার সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এক মিডিয়া বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “নিবন্ধনবিহীন পোর্টালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, তবে সেটি অবশ্যই আইনি কাঠামোর মধ্যেই হওয়া উচিত।
একটি অনলাইন পোর্টালের সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন বলেন, “পুলিশ চাইলে আইনের আওতায় তদন্ত করতে পারে, কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।
সাংবাদিক নেতা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, “এ ধরনের নির্দেশনা গণমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।
সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী মত দেন, “লাইসেন্স প্রদান বা বাতিল সম্পূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন, নইলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এক তরুণ সাংবাদিক শাকিল মাহমুদ মন্তব্য করেন, “গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে ভবিষ্যতে এর অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে।
সব পক্ষের মতামত ও বিদ্যমান আইনগত কাঠামো বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, বিষয়টি সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন ও সমন্বয় জোরদার করা জরুরি।
বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই মতামত দিয়েছেন, ভুয়া তথ্য ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধের পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনগত সীমারেখা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ নীতিমালা, সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
তাদের মতে, পারস্পরিক আলোচনা ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো গেলে একদিকে যেমন অনিয়ম বন্ধ হবে, অন্যদিকে গণমাধ্যমের স্বাভাবিক কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে।








