সঞ্চয় বলতে যারা কেবল অর্থ-সম্পদকে গচ্ছিত করা বুঝি তাদের কাছে বিষয়টিকেপুনর্বার বিবেচনা করতে বলি। নিজের ইচ্ছা পূরণ, সঙ্গীর শখ আমলে নেওয়া কিংবা সন্তানকে স্বাভাবিকভাবে গড়ে তুলতে যা যা বিনিয়োগ করতে হয় তার সবটাই সঞ্চয়। সঞ্চয় কেবল অর্থের সাথে সম্পর্কিত নয় বরং কখনো কখনো এটা সময়ের সাথেও জড়িয়ে। সন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষায় মানুষ করার চেয়ে মহৎ কোনো সঞ্চয় হতে পারে না।
সামর্থ্যবানের দ্বারা অসমর্থকে উপকার করাও সঞ্চয়ের সুন্দরতম আঙ্গিক। প্রতিবেশীদের অসহায়ত্বে পাশে দাঁড়ানো, ভাই-বোনের দিকে ভালোবাসা ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে রাখা, ভাইপো-ভাগ্নেদের পাশে সাধ্যমতো থাকতে পারা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের এমনতর রূপ যা সবচেয়ে লাভজনক হয়ে ফেরত আসবে। উপকারভোগীদের কেউ কেউ অকৃতজ্ঞ হলেও যেন সঞ্চয়ের এই সুশোভিত রূপের বিন্যাস ও বিকাশ থেমে না থাকে। ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের চেয়ে কখনো কখনোপ্রিয়জনেরবাড়িয়ে দেওয়া হাত বেশিদরকারি মনে হবে। দোয়া অস্বীকারে সাধ্য কারো থাকতে পারে না।
সম্পদও সঞ্চয় করতে হবে। তবে তা কৃপণতা না করে। প্রয়োজন মেটানো হতে হবে প্রথম বিবেচনা। প্রিয়জনের, প্রতিবেশীদের যে হক আছে তা শোধ করে তারপরে সঞ্চয় যাপিত জীবনের বিশুদ্ধ পদ্ধতি। নিজেকে বঞ্চিত করে, অন্যদের হকের পথ রুদ্ধ করে এবং কেবল ভবিষ্যতের নেশায় ডুবে বর্তমানকে উদযাপন না করতে পারলে ভবিষ্যতও পক্ষে নাও দাঁড়াতে পারে। কত শত মানুষ গত হয়েছে যাদের সঞ্চিত সঞ্চয় তাদের কোনো উপকারে আসেনি। যাদের জন্য রক্ত ঘাম করে জমিয়ে গেছে তারাও সে-সব সুপথে ব্যয় করার যোগ্য হয়ে ওঠেনি। আবার অনেকের সম্পদের সাথে প্রিয়জনদের অভিযোগ-অভিশাপ জড়িয়ে আছে। অভিসম্পাত বহন করে কেউ চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। সম্পদ অনেককেই সুপথ দেখায় না।
অর্থ-সম্পত্তি জীবনের পাথেয়। তবে ভালোবাসা তারচেয়েওজরুরি। যে যৌক্তিক ইচ্ছাকে দমন করে ব্যাংকে অঙ্ক বড়ো হলো সে ইচ্ছা বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে দাফন হয়ে যাবে। ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ, আইসক্রিমের স্বাদ কিংবা চাঁদের মোহময়তা বয়সের ফ্রেমের নির্দিষ্ট পরতের সাথে জড়িত। প্রিয়ার আব্দার, সন্তানের আনন্দ কিংবা আত্মীয়জনদের অবদানের দেনা শোধ- সময়ের একটা অঙ্গনে আফসোসের জন্ম দেবে। যা করা উচিত ছিল তা না করার কারণে বিবেক একসময় কৈফিয়ত চেয়ে বসবে।
যেহেতু ভবিষ্যৎ আছে সেহেতু কিছু কিছু জমাতে হবে। তবে এক্ষেত্রে কোনো অসুস্থ মানসিকতা সম্পন্নের সাথে প্রতিযোগিতা করা যাবে না। কার ব্যাংকে কী আছে, দালান-কোঠা, গাড়ি-নারী কার কত জমেছে তার হিসেব অস্বস্তিকর এবং অশান্তির উদ্রেককারী। নিজের যোগ্যতা এবং সামর্থ্যের সমন্বয় করে পরিকল্পিত জীবন গড়তে হবে। অল্পতেসন্তুষ্টি পরম সুখের সাক্ষাৎ দেয়। গড়তে হবে এবং ঘুরতে হবে। সন্তানসমদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে। অধিকার জন্মানোদের দাবির কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। এখনই, এখানেই একটু ভালো থাকার জন্য ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা দূরে রাখতে হবে। সময় যখন যে অবস্থায় সামনে দাঁড়াবে তখন সময়কে সেভাবেই মোকাবিলা করতে হবে।
খেয়ে না খেয়ে কেবল আগামী আগামী করলে আজ পক্ষে থাকবে না। যার আজ নেই তার কালও নিজের করে হবে না। সংসারে সঞ্চয়ের বহুমাত্রিক খাত আছে। বাবা-মায়ের দোয়া অর্জন করতে হবে। ভাই-বোনের সাথে জীবনের সব অঙ্গনে সুসম্পর্ক রাখতে হবে। স্ত্রী-সন্তানের চাওয়ার সাথে পাওয়ার যোগসূত্র ঘটাতে হবে। প্রিয়জন, প্রয়োজন এবং প্রতিবেশীদের সাথে সদ্ভাব সংরক্ষণ করতে হবে। এরপরেরঅবশিষ্টাংশের সঞ্চয় একটা অর্থবহ জীবন নির্মাণ করতে পারবে। ভোগ না করে রোগ বাঁধিয়ে ওষুধ কেনার আয়োজন করলে সেটা মোটেও স্বাভাবিক জীবন হবে না। জীবনভর দুশ্চিন্তার বোঝা বহন করলে তাতে লাভ কার?
আয়ের একটা অংশ সঞ্চয় হোক। বিজ্ঞরা বলেন, সেটা মোটের বিশ ভাগ। সেটা ব্যাংকে সঞ্চয়, ব্যবসায় বিনিয়োগ- লাভজনকভাবে যেকোনো উপায়ে হতে পারে। বাকিটা কেবল নিজের নয় বরং তাতে অন্যেরও ভাগ আছে। সন্তানের আব্দার, সংসারের প্রয়োজন- সবকিছুতে ভারসাম্য করে চলতে হবে। বুকের পাশের ভালোবাসা, অতীতের কাছে রেখে আসা ঋণ এবং ভবিষ্যতের হাতছানি- দায়িত্ববান তো এর একটাও অস্বীকার করতে পারে না। কাজেই সঞ্চয়ের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি আমাদের পক্ষজাত হোক। যে সঞ্চয় জীবন উপভোগের স্বাদ বিসম্বাদ করে তা পরিত্যাজ্য করতেই হবে। জীবনের আঙিনা ভরে উঠুক সুখের আলোয়। কেউ যেন স্বার্থপর বলে অভিযোগের তীর ছুড়তে না পারে- সর্বত্রই উপকারী মানুষ হিসেবে থাকতে হবে।
যারা উপকার করে তাদের ছাল থাকে না। অর্জুনের ছাল-বাকল দিয়ে শোধ করতে হয় অন্যের স্বার্থ। মানুষদের উপকার করেও তিক্ত কথা শুনতে হতে পারে তবুও দায়িত্বের এই মহান দিকটি বন্ধ করা যাবে না। সাধ্যমতো, সামর্থ্যানুযায়ী এমনকি নিজেের শখ-স্বার্থের কবর দিয়েও অন্যের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা, আনন্দ দেখার চেষ্টা অব্যাহত থাকুক। সন্তানের জন্য একটা জীবনের সব শখ-আহ্লাদ উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়াই সঞ্চয়ের সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত পথ। স্ত্রীর হাসিমুখের জন্য জীবন বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে কাপুরুষতারআলামত নাই। আমরা মানুষ হিসেবে যে জীবনটা পাই সেটা আসলে অন্যদের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়ার জন্যেই পাই। কখনও কখনওভুলবশত তা নিজের মনে করে ভোগ করতে আরম্ভ করি। তখনই সংসারে বিপত্তি শুরু হয়।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com







