আমাকেও যদি অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয় তবুও খুনীদেরকে/দায়ীদেরকেবিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা সমর্থন করি না। কোনো দোষীকে কথিত ক্রসফায়ার দেওয়া মানে আরও অনেক নির্দোষকেও বুলেটের সামনে দাঁড় করানোর ঝুঁকি তৈরি করা। জলজ্যান্ত প্রমাণ তো আমাদের স্মৃতিতেই আছে। বিগত আমলে অপরাধ দমনের নামে কত মানুষকে যে ন্যায়তঅন্যায়ভাবে সাজানো কথিত ক্রসফায়ারের মাধ্যমে খুন করা হলো। ভাগ্যের জোরে পঙ্গু হয়ে বেঁচে যাওয়া লিমনের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? কী অমানবিক ও বর্বরোচিতবাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে লিমন ও তাঁর পরিবারকে। তৎকালের বাংলাদেশ এমন দৃষ্টান্ত অসংখ্য। আবারও সরকারকে বিচারবহির্ভূতহত্যাকাণ্ডের দিকে প্ররোচিত করা হচ্ছে এবং সরকারকে বিপদে ফেলতে এটা একটা পরিকল্পিত ফাঁদ হতে পারে। বিএনপি সরকার এই দুর্নামে আটকে না যাক। একবার বিচারবহির্ভূতহত্যাকান্ড আবার চালু হলে মানবতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
ধর্ষণ, হত্যা কিংবা আরও যত ভয়ঙ্কর অপরাধ তা সরকার বা রাষ্ট্র করে না। করে রাষ্ট্রের নাগরিক। অপরাধীকে দলমতের চশমা দিয়ে দেখা আমাদের দৈন্য মানসিকতার প্রকাশ। অপরাধীর কোনো ধর্ম ও দল থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। জনগণকে বিবেচনা করতে হবে- রাষ্ট্র অপরাধকে প্রশ্রয় দিচ্ছে কি-না? যদি অন্যায়কে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয় তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে ধৈর্য ধরতে হবে। যিনি ভুক্তভোগী তাকে ভরসা দিতে হবে- বিচার পাবে। তবে অপরাধ ঘটার পরে বিচার করার চেয়ে অপরাধের লাগামটানাবেশিজরুরি। এক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বেশি প্রশংসনীয়।
বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে তা থেকে রাষ্ট্রকে বের হয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্র, সরকার, উকিল কিংবা বিচারক- সবাই সত্যের পক্ষের হোক। পূজা, আছিয়া, রামিসা কিংবা অন্যান্যরা- সব ফুলগুলোকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দানবদের কবল থেকে শিশু এবং নারীদেরকে নিরাপদ রাখার জন্য যে সকল বৈধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। তবে ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটেনজরদারি করার সক্ষমতা ও সামর্থ্য রাষ্ট্রের নাই। নাগরিকদেরকেও সচেতন হতে হবে। আমরা ট্যাক্স দেই বলে সব দায়-দায়িত্ব রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয় দিয়ে অবচেতনভাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ নাই। সমাজে, আমাদের চারপাশে এই প্যাথলজিক্যাল অপরাধীদের সংখ্যা বাড়ছে কেন- সমাজ ও রাষ্ট্রের সেই কারণের মূলে বিচরণ করতে হবে। ধর্ষণকামীতায় যা যাঅনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে তা রুখে দিতে হবে। হত্যা করার প্রবণতা কেন মাথায় চাপছে সেটারও তত্ত্ব-তালাশ করা জরুরি। প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে হবে। নয়ত সমাজ বাসযোগ্য থাকবে না।
রাষ্ট্র কোনোভাবেই যেন পুনর্বারবিচারহীনতার সংস্কৃতির দিকে না হাঁটে। ধর্ষণ ও শিশু হত্যার চমৎকার আইন রাষ্ট্রের কাছে আছে। সেটার ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব। জনগণকে এই কাজে রাষ্ট্রকে সহায়তা করতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে আন্দোলন বিরোধীদলের কাজ। তবে সবকিছুর সমাধান আন্দোলনের দ্বারা হয় না। কখনো কখনো সহায়তাও সমাধানের জন্য জরুরি হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে বিচারবিভাগকে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন ও দুর্নীতিমুক্ত এবং উকিলগণকেবিবেকবানহতেই হবে। পয়সার লোভে সত্যকে মিথ্যা দিয়ে আচ্ছন্ন করে দেওয়ার আইনি কৌশলের খেলায় যেন আইনজ্ঞরা না মাতে। তাদের কন্যার প্রতিচ্ছবি যেন ধর্ষিতারমুখমন্ডলে দেখতে পায়। আবারও বলছি, অপরাধ যত বড়ই হোক কোনোভাবেইবিচারহীনতার সংস্কৃতি নয়। অতীতের বাংলাদেশে অনেককিছুর চরম ভুল প্রয়োগ হয়েছে। যা জাতিবিনাশী হিসেবে এখন প্রতীয়মান।
রামিসার ক্ষত-বিক্ষত দেহ, ধড় থেকে খণ্ডিত মুখমন্ডল ঘুমের ঘোরেও দুঃস্বপ্ন দেখায়। খেতে অস্বস্তি, ঘুমাতে পারছি না। তীব্র মানসিক যন্ত্রনায় ভূগছি। রামিসার মাঝে আমার কন্যা রাইসার ছায়া দেখেছি। আতঙ্কের কবল থেকে আমাদের চির মুক্তি জরুরি। বিচারকের কণ্ঠ থেকে ন্যায় বিচারের ঘোষণা শোনার অপেক্ষায় আছি। রামিসার জন্য সারা বাংলাদেশের জেগে ওঠা যথেষ্ট যৌক্তিক, রামিসার বাবা-মায়ের কাছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিত হওয়াও মানবিক তবে অপরাধীর বিচার আইন মেনে যথাযথ প্রক্রিয়ায় হওয়া জরুরি। হত্যা-পাল্টা হত্যা সর্বত্র এবং সবসময় ক্ষমতাধর/বানদেরজিতিয়ে দিবে। অথচ আদালতের এজলাসে যদি ন্যায়বিচার থাকে তবে চিরকাল সত্যই জিতবে। তখন ক্ষমতার পক্ষ-বিপক্ষ, অপরাধীর অর্থ-বিত্ত বিবেচ্য হবে না। আমরা যেন অপরাধের ন্যায্য বিচারপ্রার্থী হই। আক্রোশ চাপিয়ে দিলে সেটা স্রেফগণহত্যার দিকে ধাবিত হতে পারে। ‘কথিত ক্রসফায়ার’ পরোক্ষভাবেহত্যাযজ্ঞ।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com








