মানুষের চুলে যখন
শীতের কুয়াশা নামে,
চোখের কোণে জমে ওঠে
অসংখ্য ক্লান্ত সন্ধ্যা,
তখনও ভিতরে ভিতরে
একটা কিশোর নদী বয়ে যায়—
যে নদী আজও প্রথম প্রেমের নাম শুনলে
ঢেউ তোলে নিঃশব্দে
মন কখনো বুড়ো হয় না।
শুধু শরীরের দেয়ালে
সময়ের কিছু ফাটল ধরে,
হাঁটুর ভেতর ব্যথা বাসা বাঁধে,
দৃষ্টির আয়নায় ঝাপসা হয় পৃথিবী,
কিন্তু মন?
সে তো আজও বর্ষার দুপুরে
কদম ফুল দেখে ভিজতে চায়,
আজও পূর্ণিমা এলে
ছাদের কার্নিশে বসে
চাঁদের সাথে গল্প জুড়ে দেয়।
বয়স শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা,
মন তার হিসেব রাখে না কখনো।
সে আজও হঠাৎ কোনো পুরোনো গানের সুরে
হারিয়ে যায় স্কুল ফাঁকি দেওয়া দুপুরে,
বন্ধুর সাইকেলের ক্যারিয়ারে চেপে
দূরের মাঠে চলে যায়।
কত মানুষকে হারিয়েছে মন,
তবুও সে বিশ্বাস করতে শেখে আবার।
কতবার ভেঙেছে,
তবুও ভালোবাসতে ভয় পায় না।
এটাই তো মনের আশ্চর্য ক্ষমতা—
ছাইয়ের নিচে আগুন লুকিয়ে রাখা।
এক বৃদ্ধ মানুষকে আমি দেখেছিলাম
রেলস্টেশনের বেঞ্চে বসে
হাতে শুকনো গোলাপ নিয়ে হাসছিলেন।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম—
“এই বয়সেও ফুল?”
তিনি মৃদু হেসে বলেছিলেন—
“বয়স তো শরীরের,
অপেক্ষা এখনো তরুণ আছে।”
সেদিন বুঝেছিলাম,
মন আসলে একটা আকাশ,
যেখানে সময়ের কোনো সীমান্ত নেই।
সেখানে শিশুরাও থাকে,
প্রেমিকও থাকে,
মায়ের জন্য কাঁদা ছেলেটাও থাকে,
আর থাকে সেই মানুষটি
যে আজও বিশ্বাস করে—
একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
মন কখনো বুড়ো হয় না।
দেখো না,
ষাট বছরের মানুষও
মেলায় গিয়ে বেলুন কিনে,
সত্তরের বৃদ্ধাও
নাতনির চুড়ি পরে আয়নায় হাসে।
কারণ মনের ভিতর
একটা গোপন বসন্ত লুকিয়ে থাকে,
যে বসন্ত কখনো ঝরে পড়ে না।
পৃথিবী যত কঠিন হয়,
মন তত নরম কোনো আশ্রয় খোঁজে।
এক কাপ চায়ের ধোঁয়ায়
সে খুঁজে পায় মায়ের রান্নাঘর,
বৃষ্টির গন্ধে খুঁজে পায়
গ্রামের কাঁচা পথ,
আর কারো মায়াভরা ডাকে
হঠাৎ কেঁপে ওঠে বহুদিনের নিঃসঙ্গতা।
মন আসলে পুরোনো হতে জানে না,
সে শুধু স্মৃতি জমায়।
পুরোনো চিঠির ভাঁজে,
নীল খামের ভিতরে,
শুকিয়ে যাওয়া বকুল ফুলে
সে লুকিয়ে রাখে তার যৌবন।
কখনো কখনো গভীর রাতে
সবাই ঘুমিয়ে গেলে
মন একা জানালার পাশে বসে
পুরোনো মানুষদের ডাকে।
যারা আর ফিরে আসে না,
তবুও মন তাদের জন্য
দরজা খুলে রাখে।
মন বড় অবুঝ।
সে হারানো মানুষদেরও
আজীবন নিজের ভেতর বাঁচিয়ে রাখে।
একটা নাম,
একটা গন্ধ,
একটা ছোঁয়া—
এই সামান্য কিছুর জন্য
সে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে পারে।
মন কখনো বুড়ো হয় না।
একদিন এক বৃদ্ধা
তার মৃত স্বামীর শার্টে মুখ রেখে বলছিলেন—
“এখনো তার গন্ধ পাই।”
আমি দেখেছিলাম
তার চোখে তখন
আঠারো বছরের প্রেম লুকিয়ে আছে।
কী আশ্চর্য না?
ভালোবাসা মানুষের শরীর ছেড়ে যায়,
কিন্তু মন ছেড়ে যায় না কখনো।
যখন কেউ বলে—
“এই বয়সে এসব মানায় না,”
মন তখন মৃদু হেসে বলে—
“ভালোবাসার কি বয়স আছে?”
এই মনই তো
শীতের সকালে রোদ পোহাতে গিয়ে
হঠাৎ শিউলি ফুল কুড়াতে চায়,
এই মনই তো
বৃদ্ধ বয়সেও
পুরোনো প্রেমিকার নাম শুনে
নিঃশব্দে কেঁপে ওঠে।
সময় শুধু মানুষকে ধীর করে,
মনকে না।
মন আজও দৌড়াতে চায়
ধানক্ষেতের আল ধরে,
আজও ট্রেনের জানালায় মুখ রেখে
অচেনা শহর দেখতে চায়।
কিছু কিছু মানুষ আছে
যাদের চোখে বয়স নামে,
কিন্তু মনের ভেতর সারাজীবন
একটা বাউল গান বাজতে থাকে।
তারা ভাঙা হারমোনিয়ামেও
স্বপ্নের সুর তোলে।
মন হলো নদীর মতো—
পাথরে ধাক্কা খায়,
তবুও থামে না।
কখনো শুকিয়ে যায়,
তবুও প্রথম বৃষ্টিতে
আবার জেগে ওঠে।
এই পৃথিবীতে
সবচেয়ে সুন্দর জিনিস হয়তো
একটা তরুণ মন।
যে মন এখনো মানুষকে বিশ্বাস করে,
এখনো আকাশ দেখে মুগ্ধ হয়,
এখনো ফুল ছুঁয়ে বলে—
“কী সুন্দর!”
মন কখনো বুড়ো হয় না।
শেষ বয়সে মানুষ যখন
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে,
তখনও মন ভিতরে ভিতরে
ঘুড়ি উড়ায় নীল আকাশে।
হয়তো শরীর আর পারে না,
তবুও মন দৌড়ায়।
একদিন আমরাও বুড়ো হবো,
চোখে চশমা উঠবে,
হাতে লাঠি থাকবে,
কণ্ঠে কাঁপন ধরবে—
তবুও যদি কোনো সন্ধ্যায়
দূর থেকে ভেসে আসে
প্রিয় কোনো গানের সুর,
আমাদের মন তখনও
নীরবে তরুণ হয়ে উঠবে।
কারণ মন হলো
সৃষ্টিকর্তার দেওয়া এক অদ্ভুত আলো,
যে আলো বয়স মানে না,
মৃত্যুকেও সহজে ভয় পায় না।
মন কখনো বুড়ো হয় না—
সে শুধু
আরও গভীর হয়,
আরও নরম হয়,
আরও বেশি ভালোবাসতে শেখে।
আর তাই পৃথিবীর সব ক্লান্ত মানুষের জন্য
আমি একটি কথাই বলতে চাই—
চুল পেকে যাক,
সময় ফুরিয়ে যাক,
জীবন যতই কঠিন হোক,
মনের জানালাটা খোলা রেখো।
কারণ যে মানুষের মন বেঁচে থাকে,
সে মানুষ কখনো সত্যিকারের বুড়ো হয় না।
Post Views: 212
Related