বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলেন আমাদের শিক্ষকেরা এবং এই ব্যবস্থার
চালিকাশক্তি হলেন শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ।
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক
গতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। আর এই গুরুদায়িত্বটি প্রধানত
এককভাবে পালন করে আসছে সরকারের একমাত্র শীর্ষ শিক্ষা ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ
প্রতিষ্ঠান—জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম)। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, বিশাল এই
শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তা বাহিনীর তুলনায় নায়েমের সক্ষমতা ও পরিধি এখনো অত্যন্ত সংকুচিত
ও সীমাবদ্ধ। ঢাকা-কেন্দ্রিক একটিমাত্র কার্যালয় দিয়ে সারা দেশের লাখ লাখ শিক্ষক ও
কর্মকর্তাকে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নায়েমের যৌক্তিক
সম্প্রসারণ এখন সময়ের অন্যতম দাবি।
আমরা বিগত বছরগুলোতে লক্ষ্য করেছি যে, শুধু শিক্ষা ক্যাডারের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য বছর
বছর অপেক্ষা করতে হয় নবীন কর্মকর্তাদের।প্রশিক্ষণের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে গিয়ে নিজ
কার্যালয়ের বাইরে ভেন্যু ভাড়া করে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করতে দেখা যায় নায়েমকে। দেশের অন্যতম
বৃহত্তম ও গুরুত্ব খাত হিসেবে শিক্ষার এমন করুন অবস্থা কাম্য হতে পারে না। দক্ষ শিক্ষক ও
দক্ষ প্রশাসক ছাড়া শিক্ষা খাত শক্তিশালী ও যুগোপযোগীভাবে গতিশীল করতে নতুন করে চিন্তা
করতে হবে সরকার ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। এ জন্য প্রয়োজন নায়েমের আঞ্চলিক সম্প্রসারণ।
প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে বর্তমানে দেশের শিক্ষা প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অবস্থা
দাঁড়িয়েছে ‘তীর্থের কাকের মতো’। একটি কাঙ্ক্ষিত প্রশিক্ষণের আশায় বছরের পর বছর অধীর
আগ্রহে অপেক্ষা করতে হয় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা স্তরের প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। সীমিত আসন ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে
নায়েম চাইলেও সবাইকে সময়মতো প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে পারছে না। ফলে বিশাল একটি অংশ
আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, আইসিটি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা অর্জন থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে শিক্ষা খাতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এমন স্থবিরতা কোনোভাবেই কাম্য
নয়।
বিপিএটিসির মডেল ও নায়েমের সীমাবদ্ধতার বিচার:
আমরা যদি জনপ্রশাসনের দিকে তাকাই, তবে দেখব বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র
(বিপিএটিসি) তার আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর (আরপএটিসি) মাধ্যমে সারা দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের
প্রশিক্ষণ বিকেন্দ্রীকরণ করতে পেরেছে। ফলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সহজেই দক্ষতার
উন্নয়ন ঘটাতে পারছেন।
অনুরূপভাবে, নায়েমকেও অবিলম্বে ঢাকার চার দেয়াল থেকে বের করে এনে বিভাগীয় বা আঞ্চলিক
পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা এখন সময়ের দাবি। আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপিত হলে যে সুফলগুলো
পাওয়া যাবে:
প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি: আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো চালু হলে একসাথে হাজার হাজার
শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হবে, যা ঢাকার একক কেন্দ্রের
ওপর চাপ কমাবে।
সময় ও অর্থের সাশ্রয়: দেশের প্রান্তিক অঞ্চল থেকে একজন শিক্ষকের প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায়
এসে দিনের পর দিন অবস্থান করার ভোগান্তি দূর হবে। ফলে সময়ের অপচয় যেমন কমবে তেমনিভাবে
দূরত্ব কম হওয়ায় সরকারকে বেশি ভ্রমণভাতা পরিশোধ করতে হবে না। এভাবে নায়েমের
বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সময় ও রাষ্ট্রীয় অর্থেরও অপচয় রোধ হবে।
তৃণমূলের চাহিদাবদ্ধ প্রশিক্ষণ: আঞ্চলিক চাহিদা ও শিক্ষার ধরণ বিবেচনা করে স্থানীয়ভাবে
কাস্টমাইজড প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করা সহজ হবে। ফলে আমরা বলতে পারি যে, শিক্ষকদের
যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়নের যেকোনো পরিকল্পনা কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ
থাকবে। নায়েমের বিকেন্দ্রীকরণ এখন বিলাসিতা নয়, সময়ের দাবি।
দক্ষ শিক্ষা প্রশাসনই আনবে গতিশীলতা:
প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত সকল স্তরের প্রশাসনিক পদে থাকা শিক্ষা প্রশাসক
এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ হলেন শিক্ষার মাঠ পর্যায়ের লিডার। তারা যদি আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক
ব্যবস্থাপনা, আর্থিক বিধিমালা এবং নেতৃত্ব গঠনে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না পান, তবে পুরো শিক্ষা
ব্যবস্থা ধীরগতির ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় স্থবির হয়ে পড়তে বাধ্য।
নায়েমের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানরা নিয়মিত ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ সুবিধা
পাবেন। এতে শিক্ষা প্রশাসনে এক ধরনের নতুন রক্তসঞ্চার হবে, যা সামগ্রিক শিক্ষাকে আরও
দক্ষ, আধুনিক এবং গতিশীল করে তুলবে।
পরিশেষে একথা বলতে পারি যে, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা
(SDG) অর্জনে মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর মানসম্মত শিক্ষার মূল চাবিকাঠি
নিহিত রয়েছে দক্ষ শিক্ষণ ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ওপর। সরকারকে অবিলম্বে নায়েমকে একটি
আধুনিক, যুগোপযোগী এবং আঞ্চলিক কার্যালয়-সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের মেগা পরিকল্পনা
গ্রহণ করতে হবে। তীর্থের কাকের মত শিক্ষকদের অপেক্ষার অবসান ঘটুক; প্রশিক্ষণের আলো
ছড়িয়ে পড়ুক দেশের প্রতিটি প্রান্তে।
মো: মহিউদ্দিন
শিক্ষক (বিসিএস সাধারণ শিক্ষা),
আমতলী সরকারি কলেজ, বরগুনা।
সম্পাদক-মাসিক ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স এবং অধুনালুপ্ত 71news24.com









