বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত বা সফল বলতে যা বোঝায়
তেমন সন্তানদের এক অসহায় মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় নাড়া দিয়েছে সবার বিবেক।
অন্তত পাঁচদিন আগে মরে যাওয়া মরদেহতে যখন পোকামাকড়ের ঘরবসতি হয়েছে
তখন আবিষ্কার হয়েছে- মানুষটি আর নেই। আন্দাজ করা যায়, ঈদের ছুটির
কোনো একদিনে মায়ের আয়ু ফুরিয়ে গেছে। তখন পাশে কেউ ছিল না। শেষ পিপাসায়
পানিহীন মৃত্যুর স্বাদ কেমন ছিল তা কেবল মৃতের আত্মাই জানে। স্যোসাল
মিডিয়ায় সে নারীর গলিত লাশ দেখার দুর্ভাগ্য হয়নি বটে তবে আলিশান বাড়ির
আধুনিক সুযোগসুবিধা সংবলিত ফ্ল্যাটে সে মায়ের রুমের যে অবস্থা দেখেছি তাতে
মনে হয়েছে কাছাকাছি সময়ে খাবার পৌঁছাতেও কেউ তার ঘরে যায়নি। সব
এলোমেলো। যেন পরিত্যক্ত কোনো ভাগাড়! এসব দেখে চিন্তার ঘরটিও সুশৃঙ্খল
নেই আর।
গাও গেরামে অশিক্ষিতি ছেলেমেয়ে অন্তত ঈদে/কোরবানিতে মৃত বাবা/মা,
দাদা/দাদীর কবরের পাশে দাঁড়ায়। সে মায়ের যে সন্তানরা বছরের বিশেষ দিনেও
বাইরের লোক ভাড়ায় এনেও মায়ের খবরাখবর জানার চেষ্টা করেনি তাদের
পরিণতির কথা ভাবতেও ইচ্ছা করছে না। একজন বৃদ্ধ মানুষ সকলের কাছে
অপছন্দের ও অস্বস্তির কী কী করতে পারে? বিছানায় পায়খানা প্রস্রাব করতে
পারে, কারো কথা নাও মানতে/শুনতে পারে, ভাংচুর করতে পারে কিংবা গালাগাল
করতে পারে। ধরছি, আরও এমনকিছু করতে পারে যা ভয়ঙ্কর। সেন্স না থাকলে
শরীরে কাপড় নাও রাখতে পারে। এরচেয়ে বড় কী করার ক্ষমতা একজন বৃদ্ধের
আছে? সেই মানুষটির পাশে কেউ নাই, তাও একদিন দু’দিন নয়, বাংলাদেশের
বাস্তবতায় এমনটা ভাবা যায়? অক্ষম একজন মানুষ একটা ফ্ল্যাটে/রুমে
দীর্ঘদিন একদন একা! একদিন দু’দিন কাজের মানুষ অনুপস্থিতি থাকতে পারে,
আধুনিক সমাজের নাতি/নাতনী বুড়ো এসব্ সহ্য করতে না পারে,
পুত্রবধু/জামাইদের দুর্গন্ধ/আচরণ অসহ্য লাগতে পারে কিন্তু গর্ভ থেকে জন্ম
নেওয়া সন্তান, বুকের দুধ খেয়ে বড় হওয়া সন্তান দীর্ঘদিন খোঁজ না নিয়ে কেমনে
পারে? অবশ্য মধ্যবিত্তের চিন্তায় যা অন্যায় উচ্চবিত্তের কাছে তা অন্যায়
মনে নাও হতে পারে।
পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগা মায়ের সন্তানদের সফলতার খসড়া দেখলাম। চোখ
ধাঁধালো। সবাই তো জীবনে ওমনটাই হতে চায়। তাদের প্রত্যেকেই গণ্য-ধন্য,
মান্য। তাদের সফলতার কোনো গল্পই মায়ের ত্যাগ ছাড়া লেখা যাবে না। সারাদিন
সংসারের কাজ শেষে সন্ধ্যায় এদের নিয়েই পড়ার টেবিলে বসেছেন মা। সকালে ঘুম
থেকে তুলে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করেছেন। হয়ত হাত ধরে মাকেই স্কুলে নিয়ে
যেতে হয়েছে সন্তানদেরকে। বিকেলে কোচিং, সপ্তাহান্তে কাপড় ধুয়ে দেওয়া-
সন্তানদের জন্য মা করেননি এমন কোন সেক্রিফাইস আছে? সেই মায়ের এমন
মৃত্যু কেন হয়? হয়তো মায়ের অপরাধ- সন্তানদের অনুমানের চেয়ে বেশিদিন বেঁচে
আছেন মা। মাকে বহন না করে বোঝা করে আলাদা করে রাখা- মানবতার চরম
অবক্ষয়ের চিত্রই বলা চলে। আমাদের সামনে এক মায়ের দুঃখজনক পরিণতি
এসেছে কিন্তু সংখ্যায় কী এই সংখ্যা কম? এই বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে
দেখিয়ে গেল- শিক্ষিত হওয়া আর মানুষ হওয়া এককথা না। শিক্ষা এবং সুশিক্ষার
মধ্যেও যোজনের ব্যবধান।
কারো মা চিরদিন বাঁচে না। কোন সন্তান বাবা-মা না হয়ে/বাবা-মায়ের বয়সে না
পৌছেঁ পারবে না। তবে সন্তানদের কপালে যে কালিমা লেপন হয়ে গেলো তা
মানবজনমে আর মুছে যাওয়ার সুযোগ না। পৃথিবীতে যারাই এই সন্তানদের চিনবে
তারা তাদের দেখে ছি ছি বলবে। যদি এমনও হয় যে- সেই সন্তানদের সাথে কারো
কোনোদিন দেখা হলো না তবুও তারা ঘৃণার কবল থেকে রক্ষা পাবে না। মা যদি
পাগলও হয়, যা যদি বদ্ধ উম্মাদও হয় তবুও কোনো মায়ের এমন পরিণতি
কুলাঙ্গার সন্তানদের দ্বারাও আর না হোক। মা-বাবার ঋণ যারা ভুলে যেতে পারে
তারা পারে না এমন কোনো কর্ম নাই্। বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতা পশ্চিমাদের
মতো মায়ামমতাহীন পরিবারের দিকে ঝুঁকছে। তবুও একজন মানুষ সাতদিন আগে
মরে থাকবে, ছড়ানো দুর্গন্ধ পেয়ে মৃত্যুর খোঁজ জানবে- এই পাপ অমোচনীয়।
জন্তু-জানোয়ারের বংশেও এমন কুকীর্তি দুর্লভ।
বাবা-মা কোনো স্বার্থের জন্য সন্তান জন্ম দেয়? দেয় না। যে মানুষগুলো গোটা
একটা জীবন সন্তানদেরকে বড় করতে, মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বস্ব উজাড়
করে দেন, সব শখ-আহ্লাদ হত্যা করেন সেই মানুষগুলো যেদিন অসহায়/অক্ষম
হয়ে পড়বে তখন সন্তান তাদের সেবাযত্ন করবে, খোঁজ খবর রাখবে- সভ্যতার
এইতো ধর্ম। গ্রাম্য দু’চারজন যদু-কদু মায়ের ভরণ পোষণ দেয় না, খোঁজ খবর
রাখে না সে এক ভিন্ন বাস্তবতা কিন্তু যারা স্বনামধন্য তাদের মায়ের জীবন
এমন অবহেলায়, অবজ্ঞায় যাবে- এটা মন মানে না। বরং ভিন্ন চিত্র চারদিকে।
সংসারের খরচ চালাতে পারে না তারপরেও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি দরদ কমে না্।
বাবা-মায়ের সুসন্তান কামনা করা উচিত। কেবল কামনা করলেই হবে না বরং
সুসন্তান গড়ে তুলতে হয়। সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষিতের মধ্যে মানবতা না
থাকলে তা পশু হয়ে ওঠে। জানি না সেই সন্তানদের সম্পর্কে বেশি বলা হয়ে যাচ্ছে
কি না, তবে পৃথিবীর কোন অভাগা মায়েরও এমন করুণ পরিণতি কামনা করি না।
বাবা-মা সন্তানের পরিবারের অংশ হয়েই বাকি জীবন পাড়ি দেবে- এই হোক
আমাদের প্রত্যাশা। যারা গত হয়েছে আগেই তারা যেন বিশেষ দিনগুলোতে
সন্তানদেরকে কবরের পাশে পায়, অন্তত সন্তানদের মনে বাবা-মা থাকে- এইটুকুন
মমতা নিয়ে পরিবারগুলো মিলেমিশে থাকুক।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com








