শিক্ষা যেকোনো জাতির মেরুদণ্ড। আর বাংলাদেশের মতো বৃহৎ জনসংখ্যার ক্ষুদ্রতম আয়তনের
একটি বৈচিত্র্যময় দেশে সেই মেরুদণ্ডকে সোজা ও মজবুত রাখার গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত থাকে বিসিএস
(সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ওপর। বর্তমান পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং
দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার
সংস্কার এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতি দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার অগ্রগতির
পূর্বশর্ত।আমরা দেখতে পাই যে, চীন, জাপান , দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর বিস্ময়কর
উন্নয়নের পিছনে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় শিক্ষা
খাতের অগ্রাধিকার। এই বাস্তবতায় বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের প্রস্তাবিত
তিনস্তরবিশিষ্ট বার্ষিক সম্মেলন কেবল একটি প্রথাগত আয়োজন নয়, বরং দেশের উচ্চশিক্ষা,
শিক্ষা প্রশাসন এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের অধিকার আদায়ের একটি যুগান্তকারী ও
ত্রিমাত্রিক রোডম্যাপ হতে পারে।
বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যগণ কর্তৃক আয়োজিত বার্ষিক জেলাপ্রশাসক সম্মেলন দেশের
প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মাঠ প্রশাসনকে শক্তিশালী ও ক্রিয়াশীলভাবে শক্তিশালী হতে সাহায্য করেছে
এবং মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক সমস্যা ও সম্ভাবনা ফুটে উঠে জেলাপ্রশাসক সম্মেলনে।
জেলাপ্রশাসক সম্মেলনের মাধ্যমে সরকার মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক বিভিন্ন তথ্য ,সুপারিশ ও
প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে সহজে নীতি নির্ধারণ করতে পারে এবং মাঠ প্রশাসনকে শক্তিশালী করতে
কৌশল গ্রহণ করতে পারে সরকার। একই সাথে এ সম্মেলন থেকে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও দাবি-
দাওয়ার কথা তুলে ধরেন জেলাপ্রশাসকগণ। ফলে সরকারের খুব কাছাকাছি থেকেই রাষ্ট্রের সেবা
করার পাশাপাশি নিজেদের সর্বোচ্চ দাবিগুলোও আদায় করতে পারছে প্রশাসন ক্যাডার।
একইভাবে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন (নন-ক্যাডার) এবং পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাডার) আলদা
আলাদা বার্ষিক সম্মেলন আয়োজন করে পুলিশের কার্যক্রম সম্পর্কে সরকারকে অবহিত করে
বিভিন্ন প্রস্তাব প্রদান করে এবং নিজের সুযোগ-সুবিধার কথা সরকারের কাছে তুলে ধরে। ফলে
সরকারের সাথে তাদের যেমন দূরত্ব কম থাকে তেমনিভাবে সরকারকে নীতি নির্ধারণে পরামর্শ
প্রদানের পাশাপাশি নিজেদের সুযোগ-সুবিধাও আদায় করে নিচ্ছে পুলিশ বাহিনী।
কিন্তু রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত শিক্ষায় এ ধরণের সম্মেলনের নজির নেই বললেই চলে।
ফলে সরকার ও শিক্ষা প্রশাসনের মাঝখানে এক অদৃশ্য দূরত্বের সৃষ্টি হয়। ফলে শিক্ষা খাতের
যথাযথ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং নিজেদের বিভিন্ন যৌক্তিক দাবি-দাওয়া নিয়ে মাঠের আন্দোলনে
যেতে দেখা যায় শিক্ষা ক্যাডার সদস্যদের। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্যাডার সার্ভিস ও রাষ্ট্রের
খুবই গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়ায় শিক্ষার সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আরোও নিবিড় ও গভীর হওয়া
প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণী
টেবিল এবং মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের অধিকার-এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রাকে এক সুতোয় গেঁথে যে
তিনস্তরবিশিষ্ট সম্মেলনের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে, তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান
অসঙ্গতি দূর করতে অত্যন্ত সময়োপযোগী।
প্রথম স্তর: তৃণমূলের দর্পণ ও সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ সম্মেলন
একটি ভবনের স্থায়িত্ব যেমন নির্ভর করে তার ভিত্তির ওপর, তেমনি দেশের উচ্চশিক্ষার মান
নির্ভর করে তৃণমূল বা স্থানীয় পর্যায়ের কলেজগুলোর ওপর। সম্মেলনের প্রথম স্তরে সরকারি
কলেজের অধ্যক্ষ সম্মেলন আয়োজন করার প্রস্তাবটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় হতে পারে। কলেজের
অধ্যক্ষগণ হলেন মাঠপর্যায়ের সেনাপতি, যারা সরাসরি শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা এবং এর
সঙ্গতি-অসঙ্গতিগুলো প্রত্যক্ষ করেন।
বিদ্যমান অসঙ্গতি ও স্থানীয় সমস্যা: বর্তমানে দেশের সরকারি কলেজগুলো তীব্র শিক্ষক সংকট,
সেশনজট-যদিও তা আগের চেয়ে কমেছে, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় গবেষণাগার ও
গ্রন্থাগারের অভাবে ভুগছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলোতে শিক্ষার গুণগত মান
ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, আবাসন সংকট
এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হারও একটি বড় অসঙ্গতি।
প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রস্তাব:
আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ: মফস্বল ও শহরের কলেজের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার যে আকাশপাতাল
ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে হবে।
স্মার্ট ক্লাসরুম ও ল্যাব প্রতিষ্ঠা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থানীয়
পর্যায়ের কলেজগুলোতে আধুনিক ল্যাব ও আইসিটি অবকাঠামো নিশ্চিত করার প্রস্তাব করতে হবে।
অধ্যক্ষদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধি: স্থানীয় পর্যায়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত
গ্রহণের জন্য অধ্যক্ষদের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি।
শিল্প-প্রতিষ্ঠান ও কলেজের সমন্বয়: স্থানীয় শিল্প-কারখানার চাহিদার সাথে সংগতি রেখে কলেজের
পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনার জন্য সংস্কার প্রস্তাব পেশ করতে হবে।
দ্বিতীয় স্তর: শিক্ষা প্রশাসনের শুদ্ধাচার ও নীতি নির্ধারণী পরামর্শ
সম্মেলনের দ্বিতীয় স্তরটি মূলত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মস্তিস্কস্বরূপ। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা
অধিদপ্তর (মাউশি), বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি),
সরকারি শিক্ষা প্রশাসন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নায়েম), বিভিন্ন অফিস পর্যায়ের দপ্তরে কর্মরত
সিনিয়র কর্মকর্তাগণ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের শীর্ষ ও সিনিয়র কর্মকর্তাদের
সমন্বয়ে এই স্তরটি গঠিত হবে।
শিক্ষা প্রশাসনের অসঙ্গতি: বর্তমানে শিক্ষা প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা।
অনেক সময় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সাথে নীতি নির্ধারকদের গৃহীত সিদ্ধান্তের কোনো মিল থাকে
না। এছাড়া, শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত বাজেটের সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহার না হওয়া এবং প্রকল্প
বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা একটি চিরচেনা অসঙ্গতি।
প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নীতি নির্ধারণী প্রস্তাব:
ডিজিটাল ও পেপারলেস প্রশাসন: মাউশিসহ শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি দপ্তরকে শতভাগ ডিজিটাল ও
স্বচ্ছ জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রস্তাব করতে হবে।
যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন: শিক্ষা প্রশাসনকে গতিশীল করতে তদবির সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে
মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করার নীতিমালা তৈরি করা।
সমন্বিত শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন: নতুন শিক্ষাক্রম বা যেকোনো বড় ধরনের শিক্ষাগত পরিবর্তনের
ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের ফিডব্যাক নিয়ে নীতি সংশোধন করার স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা।
সরকারকে স্ট্র্যাটেজিক পরামর্শ: শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নে জিডিপির একটি
উল্লেখযোগ্য অংশ-কমপক্ষে ৪-৬ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ নিশ্চিত করতে এবং সেই বরাদ্দের সঠিক
ব্যবহারে সরকারকে সুনির্দিষ্ট ও প্রায়োগিক পরামর্শ প্রদান করা।
তৃতীয় স্তর: বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন ও ক্যাডার বৈষম্য নিরসন
সম্মেলনের তৃতীয় এবং চূড়ান্ত স্তরটি শিক্ষাবিদদের নিজস্ব মর্যাদা ও অধিকারের প্ল্যাটফর্ম।
বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই স্তরে শিক্ষা ক্যাডারের
সদস্যদের পেশাগত উন্নয়ন, অধিকার এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বৈষম্য নিরসনে সরকারের কাছে
সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরা হবে।
একটি নির্মম সত্য: রাষ্ট্রের অন্য যেকোনো ক্যাডারের তুলনায় শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা
পদোন্নতি, পদমর্যাদা এবং সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে চরম অবহেলার শিকার। একজন শিক্ষা
ক্যাডার কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই পদে স্থবির হয়ে থাকেন, যা তাদের পেশাগত মোটিভেশন
ধ্বংস করে দিচ্ছে।
সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার সংক্রান্ত প্রস্তাবাবলী:
পদোন্নতির জট নিরসন: ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি নিশ্চিত করা এবং প্রশাসন বা অন্যান্য ক্যাডারের
মতো শিক্ষা ক্যাডারেও পদ না থাকলেও ব্যাচভিত্তিক ও সংখ্যাতিরিক্ত পদোন্নতির ব্যবস্থা করা।
উচ্চতর গ্রেড ও স্কেল প্রদান: অধ্যাপক পদটিকে ১ম গ্রেডে উন্নীত করা এবং সহযোগী ও সহকারী
অধ্যাপকদের জন্য যথাসময়ে উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করা।
শিক্ষা ক্যাডার সার্ভিসের স্বতন্ত্রীকরণ: শিক্ষা ক্যাডারের জন্য একটি স্বতন্ত্র 'শিক্ষা সেবা
কমিশন' বা বিশেষায়িত কাঠামো গঠন করা, যাতে এই ক্যাডারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন অন্য কারও
দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়।
গবেষণা ও আবাসন ভাতা: শিক্ষকদের জন্য বিশেষ গবেষণা তহবিল গঠন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে
কর্মরত শিক্ষকদের জন্য ঝুঁকি ও আবাসন ভাতার ব্যবস্থা করা।
পরিশেষে একথা বলতে পারি যে, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের এই তিনস্তরবিশিষ্ট বার্ষিক
সম্মেলনের পরিকল্পনাটি একটি ত্রিমাত্রিক বা অল-অ্যারাউন্ড মডেল। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন
একদম তৃণমূলের ক্লাসরুমের সমস্যাগুলো উঠে আসবে, অন্যদিকে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা
সেই সমস্যা সমাধানের আইনি ও প্রশাসনিক পথ খুঁজবেন এবং সবশেষে শিক্ষকরা স্বস্তিতে কাজ
করার মতো পেশাগত অধিকারের নিশ্চয়তা পাবেন।
শিক্ষা ক্যাডারকে বঞ্চিত রেখে বা দুর্বল করে কখনো একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
সম্ভব নয়। শিক্ষকরা যদি পদোন্নতি আর অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের দুশ্চিন্তায় থাকেন, তবে
ক্লাসরুমে তারা শতভাগ দিতে পারবেন না-এটাই স্বাভাবিক।
আমরা আশা করি, এই প্রস্তাবিত বার্ষিক সম্মেলনটি কেবল আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে
না। সরকার এই সম্মেলনের যৌক্তিকতা অনুধাবন করে এর আয়োজনে পূর্ণ সহযোগিতা দেবে এবং
সম্মেলন থেকে আসা সুপারিশ ও প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। একটি বৈষম্যহীন,
মেধাভিত্তিক ও আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই তিনস্তরবিশিষ্ট সম্মেলন শিক্ষা খাতের জন্য
টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে প্রমাণিত হোক-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মো: মহিউদ্দিন
শিক্ষক (বিসিএস সাধারণ শিক্ষা),
আমতলী সরকারি কলেজ, বরগুনা।
সম্পাদক-মাসিক ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স









