রংপুর ব্যুরো: রংপুরে স্মরণকালের প্রচÐ তাপদাহে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। তীব্র রোদ আর গরম বাতাসে জনজীবন বিপর্যস্ত। প্রচÐ রোদ আর ভ্যাপসা গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে কৃষক ও কৃষি শ্রমিকরা। মাঠে কাজ করতে গিয়ে টানা এক ঘণ্টাও টিকতে পারছেন না তারা। কিছুক্ষণ কাজ করেই গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। এতে কৃষি কাজের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি কমেছে শ্রমিকদের দৈনিক আয়। বর্তমানে রংপুর অঞ্চলের মাঠে বোরো ধান ও ভুট্টা কাটার শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। ফসল শুকিয়ে ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষকরা। কিন্তু প্রচÐ তাপপ্রবাহের কারণে কৃষি কাজে দেখা দিয়েছে ধীরগতি। রংপুর সদর উপজেলার কৃষি শ্রমিক জহির আলম বলেন, আমাদের এলাকায় কয়েকদিন আগেও টানা বৃষ্টির কারণে মাঠে নামতে পারিনি। এখন বৃষ্টি নেই, কিন্তু গত ৫/৬ দিন ধরে প্রচÐ গরম পড়েছে। ফলে রংপুর অঞ্চলের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মাঠে টানা এক ঘণ্টা কাজ করলেই শরীর জ্বলে উঠেছে। বাধ্য হয়ে গাছের নিচে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হয়। একই গ্রামের কৃষি শ্রমিক ইসমাইল ও এনদাত আলী বলেন, বর্তমানে ধান ও ভুট্টা কাটার মৌসুম। আমরা চুক্তিভিত্তিক জমিতে ধান ও ভুট্টা কাটার কাজ করি। আবহাওয়া অনুক‚লে থাকলে ৬ জনের একটি দল দুই ঘণ্টায় এক বিঘা ধান এবং তিন ঘণ্টায় এক বিঘা ভুট্টা কাটা যায়। কিন্তু তীব্র গরমের কারণে এখন একই কাজ করতে প্রায় তিনগুণ বেশি সময় লাগছে। ফলে আয়ও কমে গেছে। মাঠে কিছুক্ষণ কাজ করলেই ছায়ায় গিয়ে বসতে হচ্ছে। পীরগাছা উপজেলার দেওতি গ্রামের কৃষি শ্রমিক জাকির বলেন, তীব্র তাপপ্রবাহে অস্থির হয়ে পড়েছি। সারাক্ষণ শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতে না পারায় মজুরিও কম হচ্ছে। ঘরে পর্যাপ্ত খাবার থাকলে হয়তো এমন গরমে মাঠে নামতাম না। কিন্তু সংসারের খরচ মেটাতে বাধ্য হয়েই কাজ করছি। আগের তুলনায় আয় এখন অর্ধেকেরও কম। একই উপজেলার বড়দারগা গ্রামের নারী কৃষি শ্রমিক আলেমা বেগম বলেন, তীব্র গরমের কারণে নারী শ্রমিকরা মাঠে বেশিক্ষণ কাজ করতে পারছেন না। বাড়িতে ধান ও ভ‚ট্টা শুকানোর কাজ করছেন। এজন্য অনেক কৃষক এখন দৈনিক মজুরির পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ করছেন। রোদ থাকায় ধান ও ভুট্টা শুকাতে সুবিধা হচ্ছে। কিন্তু মাঠে থাকা ফসল কাটতে গিয়ে বড় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। নারী শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারছেন না। কাউনিয়া উপজেলার কৃষক মিজান মিয়া বলেন, ক্ষেতের ধান শতভাগ পেকে গেছে। দ্রæত কেটে ঘরে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যারা আসছেন তারাও বেশিক্ষণ কাজ করতে পারছেন না। তীব্র তাপপ্রবাহে মানুষ তো বটেই, গবাদিপশু ও পাখিরাও ছায়া খুঁজছে। তারপরও অনেক কৃষক ও কৃষি শ্রমিক বাধ্য হয়ে মাঠে কাজ করছে। তাদের কেউ কেউ অসুস্থও হয়ে পড়ছেন। পীরগাছা বাজারের রিকশাচালক কাজী জাফর বলেন, প্রচÐ গরমে মানুষ অকারণে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ফলে যাত্রীও কমে গেছে। গরমে রিকশা চালানোও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। আয় আগের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। এভাবে গরম চলতে থাকলে সংসার চালাতে ঋণ করতে হবে। সকাল সাতটা বাজতেই রোদের প্রখরতা বাড়তে শুরু করে, সঙ্গে বইছে গরম বাতাস। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে স্কুলগামী শিশু ও শ্রমজীবী মানুষ। অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা দেখা দেওয়ায় অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। নগরীর মোড়ে মোড়ে আখের রস ও ঠান্ডা পানীয়র দোকানে তৃষ্ণা মেটাতে মানুষের ভিড় বাড়ছে। প্রখর রোদের কারণে দুপুরের আগেই রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে যাচ্ছে। দিনের তীব্রতা কমলেও সন্ধ্যার পর গরমের তেজ কমছে না, ফলে রাতের বেলাতেও মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত বুধবার সকালে রংপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ৬ দিন ধরে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৬ থেকে ৩৭ দশমিক ২ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। গত বছরের একই সময়ে তাপমাত্রা ছিল ৩৪ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় গরমের তীব্রতা আরও বেশি অনুভ‚ত হচ্ছে। দ্রæত বৃষ্টিপাত না হলে তাপপ্রবাহের প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও জনজীবনের ওপর আরও বাড়তে পারে। রংপুর আঞ্চলিক কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে মাঠে এখনও ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ধান ও ভুট্টা রয়েছে। কৃষক ও কৃষি শ্রমিকরা তীব্র তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে ফসল কাটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কৃষক ও শ্রমিকদের দুপুরের প্রখর রোদ এড়িয়ে কাজ করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘ সময় মাঠে অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।







