ভৌগোলিক আয়তনের বিশালত্ব কোনো দেশের কৃষি-উর্বরতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট স্থলভাগের গড় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ১০.৭১ শতাংশ। তবে এই বৈশ্বিক গড়ের বিপরীতে এক অবিশ্বাস্য ব্যতিক্রম আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়া।
সাধারণভাবে বড় রাষ্ট্রগুলোর আবাদি জমি বেশি মনে হলেও, দেশের মোট আয়তনের অনুপাতে হিসাব করলে বিশ্বের সমস্ত পরাশক্তিকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যেখানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সিংহভাগ ভূমি মরুভূমি, পাহাড় কিংবা বরফে ঢাকা থাকে, সেখানে বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৬০.৬ শতাংশ জমিই সরাসরি চাষের উপযোগী। বিপরীতে, বিশাল আয়তনের দেশ হওয়া সত্ত্বেও শতাংশের হিসাবে ভারতের অবস্থান বিশ্বে ৫ম (৫১.৭%) এবং পাকিস্তানের অবস্থান ১৪তম (৩৯.৩%)।
আয়তনে ছোট হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের এই অভূতপূর্ব অর্জনের পেছনে কাজ করেছে কিছু অনন্য প্রাকৃতিক মেকানিজম।
বাংলাদেশ মূলত গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা বিশ্বের বৃহত্তম সক্রিয় বদ্বীপ। হাজার বছর ধরে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদ-নদীগুলো প্রতি বছর কোটি কোটি টন খনিজসমৃদ্ধ পলিমাটি বহন করে নিয়ে আসে। যা মাটিকে কৃত্রিম রাসায়নিক ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত উর্বর ও ফসল উৎপাদনের উপযোগী করে তোলে।
তাছাড়া চীন, রাশিয়া কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশাল রাষ্ট্রে পর্বতমালা, মালভূমি বা স্থায়ী বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলের কারণে মোট ভূখণ্ডের বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকাই প্রাকৃতিকভাবে সমতল সমভূমি। ফলে দেশের সিংহভাগ অঞ্চলের মাটিই চাষাবাদের আওতাভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর কারণে বাংলাদেশে তীব্র শীত বা দীর্ঘস্থায়ী বরফ পড়ার মতো কোনো জলবায়ুগত প্রতিবন্ধকতা নেই। পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং নিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে এখানকার কৃষিজমিগুলো সারাবছর সচল থাকে। ফলে একই জমিতে বছরে একাধিকবার ফসল ফলানো বা ‘মাল্টি-ক্রপিং’ প্রাকৃতিকভাবেই সহজ হয়ে যায়।
সহজ কথায়, ভৌগোলিক আয়তনে বাংলাদেশ ছোট হতে পারে, কিন্তু সম্পদের ঘনত্ব বা ‘রিসোর্স ডেনসিটি’র দিক থেকে এই মাটি পৃথিবীর অন্যতম এক অনন্য বিস্ময়।








