আড়াই বছর ধরে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে মেজর জাহিদের লাশ পড়ে থাকলেও, তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি!
মেজর “জাহিদুল ইসলাম”, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যতম একজন ডিসিপ্লিন, চৌকস,আর মেধাবী সেনা অফিসার হিসেবে তার পরিচিতি ছিল! ২০০০ সালে ৪৩-তম বিএমএ লং কোর্সের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে কমিশন পান তিনি।
২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার রূপনগরে, নিজের ভাড়া বাসায় নিচেই তাকে জঙ্গি বানিয়ে বন্দুক যুদ্ধের নাটক সাজিয়ে খুব কাছ থেকে ২৯ রাউন্ড গুলি চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়! দীর্ঘ ৮ বছর ধরে জাতির কাছে জঙ্গি হিসেবে পরিচয় পাওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বেরিয়ে, আসে এক নির্মম সত্য। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি অভিযোগ ঘটনার পেছনের কাহিনী বের করে জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল!
এটি ছিল পিলখানা হত্যাকান্ডের অন্যতম সাক্ষীকে চিরতরে নিস্তব্ধ করে দেওয়ার নীল নকশা! অথচ এই সেনা অফিসার কঙ্গোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন,পাকিস্তানে মিড ক্যারিয়ার কোর্স, কানাডায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ শেষ করে হয়ে উঠেন দক্ষ এক অফিসার।
২০০৯ সালে তাকে পিলখানায় পোস্টিং দেওয়া হলেও তিনি ত যোগদান করেননি। ওই সময় পিলখানায় পোস্টিংয়ে ছিলেন তারই বন্ধু ক্যাপ্টেন শহীদ মাজহারুল হায়দার। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সেই নৃশংস হত্যাকান্ডের সময় মেজর জাহিদ কে ফোন করেন ক্যাপ্টেন মাজহারুল।
মাজহারুল বলেন বন্ধু আমাদের সব অফিসারদের মেরে ফেলছে! কারা মেরেছে মেজর জাহিদ জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন মাজহারুল বলেন কিছু হিন্দুভাষী ব্যাক্তি যাদের তিনি কখনোই পিলখানায় দেখেন নি!
পিলখানা ঘটনার পরও মেজর জাহিদ অনেক বেশি সোচ্চার ও প্রতিবাদী ছিলেন। তিনি জানতেন অনেক গোপন আর স্পর্শকাতর সত্য! সত্যের পথে অবিচল থাকা এই সেনা অফিসারকে কোনোভাবে কেনা, আর দমানো সম্ভব না হওয়ায় তাকে ২০১৫ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়।
অবসরের পরেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না, তার কাছে থাকা তথ্য তৎকালীন সরকারের ভীত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। সেজন্যই সাজানো হয় এক ভয়ংকর জঙ্গি নাটক! আর সেটা মঞ্চায়িত করা হয় ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর।
রাত ১০টায় মেজর জাহিদের বাসা থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ভয়ানক নির্যাতন করে, তার হাত দু’টো পেছন থেকে বেঁধে হাতগুলো কে পিটিয়ে কাঁধ থেকে আলাদা করা হয়! তার মুখমণ্ডল বিকৃত করে বাসার নিচে নামিয়ে খুব কাছ থেকে ২৯ রাউন্ড গুলি চালিয়ে ঝাঁঝরা করা হয় তার বুক।সেদিন পুলিশ এতোটাই হিংস্র ছিল যে, মেজর জাহিদের চোখ দুটোও কোটর থেকে বের করে ফেলে!
অথচ রূপনগর থানার এজাহারে উল্লেখ করা হয় পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে নাকি মেজর জাহিদ চাকু আর পিস্তল নিয়ে চড়াও হয়েছিল! আত্মরক্ষার্থে তারা নাকি ২৯ রাউন্ড গুলি চালিয়ে ঝাঁঝরা করে মেজর জাহিদের বুক।
ফরেনসিক রিপোর্ট আর প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী এটি ছিল সম্পুর্ন একটি নাটক। মেজর জাহিদ হত্যার পর সবচেয়ে নির্মম ব্যাপার হচ্ছে, আড়াই বছর ঢাকা মেডিকেলের মর্গে মেজর জাহিদের লাশ পড়ে থাকলেও, তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
এরপর পরিবার লাশটাও খুঁজে পায়-নি! আহ! মেজর জাহিদ হত্যার সত্য যেনো বের হয়ে না আসে তাই পরিবারের উপরও চালানো হয় রোলার কোস্টার! মেজর জাহিদকে হত্যার রাতেই তার স্ত্রী আর দুই শিশু সন্তানকে, চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় মেজর জাহিদ কে হত্যার পূর্বেই।
প্রায় ৪ মাস সাত দিন দুনিয়ায় আলো দেখতে না দিয়ে ডিবির কথিত আয়নাঘরে বন্দী রাখা হয় স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা আর ১ বছরের ছোট মেয়েকে! ৫ বছরের বড় মেয়েকে নানা নানুর কাছে দেবার কথা বলে, ৭ দিন পর নেওয়া হলেও ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাতে তৈরি করা হয় আরেক জঙ্গি নাটক!
মেজর জাহিদ হত্যার ৯ দিন পর বড় মেয়েকে ঢাকার আজিমপুরে কথিত জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ৩ শিশু উদ্ধারের নামে তাকে উদ্ধার দেখানো হয়। সেদিন ৩ শিশু আটকের মধ্যে ছিল মেজর জাহিদের ৫ বছরের নিষ্পাপ বড় মেয়ে, ৫ বছরের শিশু জুনাইরা বিনতে জাহিদও!
আর ২০১৬ সালে ২৪ ডিসেম্বর ৪ মাসের অধিক সময় নির্যাতনের পর আরেক জ-ঙ্গি নাটক সাজিয়ে, মেজর জাহিদের স্ত্রী আর ছোট মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়! এরপর স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলার ভাগ্যে জুটে একের অধিক জঙ্গি মামলা!
সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে মেজর জাহিদকে হত্যার এক বছরের মধ্যে ছেলের মৃত্যু সইতে না পেরে, মেজর জাহিদের বাবা-মা দু’জনই স্টোক করে মৃত্যু বরন করেন!
দীর্ঘ প্রায় ৪ বছর কারাবরণের পর মেজর জাহিদের স্ত্রীর জামিন মিললেও কোন এক অজানা শঙ্কায় তার জামিন বাতিল করে দুই বছর পর আবার হাজতে প্রেরণ করা হয়!
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ৩১ আগস্ট তার আবার জামিন হয়! কিন্তু মুক্তি মেলেনি অভিশপ্ত জঙ্গি মামলা থেকে, এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন এই বোঝা। একটা পরিবারকে ঠিক নিজের ক্ষমতা টিকেয়ে রাখার স্বার্থে এতো নির্মমভাবে ধ্বংস করে দেওয়ায় চেয়ে নৃশংস আর কি হতে পারে?
Post Views: 144
Related