কল্পনা করুন, আপনি সান ফ্রান্সিসকোর কোনো বারে বসে ড্রিঙ্ক করছেন। হঠাৎ আপনার আলাপ হলো এক সুন্দরী মহিলার সাথে। কথায় কথায় তিনি আপনাকে তার ফ্ল্যাটে কফি খাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। আপনি ভাবলেন আজকের রাতটা আপনার জীবনের সেরা রাত হতে চলেছে।
কিন্তু আপনি জানতেন না, সেই ফ্ল্যাটের বাথরুমে বসে একজন সরকারি অফিসার মার্টিনি হাতে জানলার আড়াল থেকে আপনার প্রতিটি গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। আর আপনার কফিতে মেশানো হয়েছে উচ্চমাত্রার এলএসডি (LSD)।
শুনতে কোনো সস্তা থ্রিলার সিনেমার গল্প মনে হচ্ছে? কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে আমেরিকার রাস্তায় এটা ছিল এক রূঢ় বাস্তব। এর নাম ছিল ‘অপারেশন মিডনাইট ক্লাইম্যাক্স’।
সিআইএ কেন এমন অদ্ভুত কাজ করছিল?
শীতল যুদ্ধের সময় সিআইএ-র মাথায় একটা পাগলামি চেপেছিল—মন নিয়ন্ত্রণ বা মাইন্ড কন্ট্রোল। তারা এমন এক ‘ট্রুথ সিরাম’ খুঁজছিল যা দিয়ে শত্রুপক্ষের মুখ থেকে সব গোপন তথ্য বের করা যাবে। এই পাগলাটে প্রজেক্টের নাম ছিল MKUltra, আর তারই একটি অংশ ছিল এই অপারেশন মিডনাইট ক্লাইম্যাক্স।
ড্রাগ, সেক্স এবং আয়নার আড়ালে নজরদারি
সিআইএ কতগুলো অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করেছিল যেগুলোকে বলা হতো ‘সেফ হাউস’। তারা কিছু যৌনকর্মীকে নিয়োগ দিয়েছিল যাদের কাজ ছিল সাধারণ মানুষকে ভুলিয়ে সেই ঘরে নিয়ে আসা। ঘরে ঢোকার পর ওই ব্যক্তিদের অজান্তেই তাদের ড্রাগ দিয়ে দেওয়া হতো।
ঘরের একদিকের দেওয়ালে থাকতো ‘টু-ওয়ে মিরর’ (যা একদিকে আয়না কিন্তু অন্যদিকে জানলা)। সেই আয়নার ওপাশে বসে থাকতেন সিআইএ অফিসাররা। তারা দেখতেন ড্রাগের প্রভাবে ওই ব্যক্তিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কী কী করছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল দেখা—ড্রাগ এবং যৌনতার প্রলোভন দিয়ে একজন মানুষের থেকে তথ্য বের করা কতটা সহজ।
সেই অদ্ভুত বাথরুমের ঘটনা
এই অপারেশনের প্রধান ছিলেন জর্জ হোয়াইট। এই লোকটা ছিল আরও অদ্ভুত। জানা যায়, তিনি সেই সেফ হাউসের বাথরুমে বসে মদ্যপান করতেন এবং আয়নার আড়াল দিয়ে পুরো নাটকটা উপভোগ করতেন। তিনি একে বলতেন “মানব আচরণের ওপর গবেষণা”, যদিও আদতে এটি ছিল চরম পর্যায়ের মানবাধিকার লঙ্ঘন।
শেষ পর্যন্ত কী হলো?
১৯৬৩ সাল নাগাদ এই পাগলামি বন্ধ হয়। মজার (কিংবা দুঃখের) ব্যাপার হলো, সিআইএ এই হাজার হাজার মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে কোনো কার্যকর ‘মাইন্ড কন্ট্রোল’ পদ্ধতি বের করতে পারেনি। উল্টো অনেক সাধারণ মানুষ স্থায়ীভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন।
১৯৭০-এর দশকে যখন এই গোপন তথ্য ফাঁস হয়, তখন সারা আমেরিকায় তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল। সিআইএ তড়িঘড়ি করে সব নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কিছু নথিপত্র বেঁচে যায়—যা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ক্ষমতার লোভে একটা সরকার কতটা নিচে নামতে পারে।
এক কথায় বলতে গেলে: অপারেশন মিডনাইট ক্লাইম্যাক্স ছিল বিজ্ঞানের নামে করা এক অন্ধকার বিকৃতি, যেখানে সাধারণ মানুষরা ছিল সিআইএ-র ল্যাবের ইঁদুর।
তথ্যসূত্র (Bibliography)
সরকারি নথিপত্র এবং রিপোর্ট:
- U.S. Senate Select Committee on Intelligence (1976). The Church Committee Report: Intelligence Activities and the Rights of Americans. Washington D.C.: U.S. Government Printing Office. (MKUltra এবং মিডনাইট ক্লাইম্যাক্সের প্রধান সরকারি উৎস)।
- Central Intelligence Agency (1973/1977). Project MKUltra Documents. Released under the Freedom of Information Act (FOIA).






