মানুষ নিজের ভেতর যে পৃথিবী বহন করে, সেটিই তার বাইরের পৃথিবীর সবচেয়ে বড়
ব্যাখ্যা। আমরা প্রায়ই অন্যের সুখ, উন্নতি বা স্বস্তিকে সহজভাবে গ্রহণ
করতে পারি না। অন্যের “আলহামদুলিল্লাহ” উচ্চারণটিও কখনো কখনো আমাদের
ভেতরে অদৃশ্য অস্বস্তি তৈরি করে। যেন অন্যের ভালো থাকা আমাদের নিজের
অভাবকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
মানুষ আসলে আনন্দের চেয়ে তুলনায় বেশি বাঁচে। তাই অন্যের প্রাপ্তি অনেক
সময় আমাদের কাছে সৌন্দর্য নয়, বরং প্রতিযোগিতা হয়ে ওঠে। কারো সফলতা,
কারো সৌভাগ্য, কারো সৌন্দর্য— সবকিছুই যেন এক অদৃশ্য মাপযন্ত্রে
আমাদের নিজেদের অবস্থানকে ছোট করে দেয়। এই তুলনাবোধই ধীরে ধীরে হিংসা
ও অস্বস্তির জন্ম দেয়।
তবু এই হিংসা কেবল নিন্দার বিষয় নয়; এটি মানবচেতনার এক গভীর
সীমাবদ্ধতাও বটে। কারণ মানুষ একই সঙ্গে চায় উন্নতি এবং নিরাপত্তা, আবার
চায় তুলনাহীন অবস্থানও। এই দ্বৈত আকাঙ্ক্ষার ভেতরেই জন্ম নেয় দ্বন্দ্ব—
যেখানে আমরা অন্যকে চাই এগিয়ে যেতে, কিন্তু খুব বেশি নয়।
আমাদের আরেকটি বড় বিভ্রান্তি হলো—নিজেকে নৈতিকভাবে নির্দোষ ভাবার
প্রবণতা। আমরা ভুলকে ব্যাখ্যা করি পরিস্থিতি দিয়ে, ব্যর্থতাকে ভাগ্য দিয়ে,
আর সাফল্যকে নিজের যোগ্যতা দিয়ে। এই অসম ব্যাখ্যাই ধীরে ধীরে আমাদের
ভেতরে এক ধরনের নীরব আত্মপ্রতারণা তৈরি করে। ফলে মানুষ নিজের ভেতরের
আয়নাটিকে আর স্বচ্ছ রাখতে পারে না।
তবু জীবন কেবল অভিযোগের গল্প নয়। মানুষের ভেতরে যেমন হিংসা আছে, তেমনি
আছে সহানুভূতি, সহযাত্রা এবং আত্মসচেতনতার সম্ভাবনাও। কেউ এগিয়ে গেলে
তাকে গ্রহণ করতে শেখা, নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করা— এগুলোই মানুষের
নৈতিক বিকাশের প্রথম ধাপ।
ফুটবল, সমাজ, প্রতিবেশী কিংবা রাষ্ট্র—সব জায়গাতেই আমরা একই
মানসিকতার পুনরাবৃত্তি দেখি। কিন্তু এই পুনরাবৃত্তির মধ্যেও পরিবর্তনের
সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। কারণ মানুষ কেবল স্বভাব দ্বারা নয়, চেতনা দ্বারা
গঠিত।
মানুষের প্রকৃত লড়াই অন্যের সঙ্গে নয়, নিজের ভেতরের দ্বৈততার সঙ্গে। যে
দিন মানুষ এই দ্বৈততাকে চিনতে পারে, সেদিনই তার ভেতরের পৃথিবী একটু শান্ত
হয়। আর সেই শান্তিই হয় সত্যিকারের মুক্তির সূচনা— যেখানে অন্যের সুখ আর
নিজের অস্বস্তি আর পরস্পরের শত্রু থাকে না, বরং জীবনের স্বাভাবিক
বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।








