মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বর্তমানে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এক জটিল ও অমীমাংসিত যুদ্ধ পরিস্থিতি। আপাতদৃষ্টিতে এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে ইরানকে কৌশলগতভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে মনে হলেও, যুদ্ধটি শেষ পর্যন্ত কোন প্রক্রিয়ায় মীমাংসিত হবে—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ধোঁয়াশার শেষ নেই। ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে কোনো এক পক্ষকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে অন্য পক্ষের একক জয়লাভ করা বর্তমান বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব। একদিকে ইরানের আত্মসমর্পণ না করার দৃঢ় প্রত্যয়, আর অন্যদিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের দম্ভ ও সামরিক চাপ এই চলমান যুদ্ধকে এক অন্ধগলিতে ঠেলে দিয়েছে।
এই সংঘাতের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি চক্রান্ত এবং ‘বৃহৎ ইসরায়েল’ গঠনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। চলমান সংঘাত যেকোনো মুহূর্তে এমন এক জটিল বা অপ্রত্যাশিত মোড় নিতে পারে, যা পুরো বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ রেখাকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম।
এখানে মূল দ্বন্দ্বটি অস্তিত্ব এবং মর্যাদার। একদিকে ইরান যদি এই অঞ্চলে নিজের প্রভাব ধরে রেখে টিকে থাকে, তবে ইসরায়েলের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে এবং তারা চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। অন্যদিকে, ইরানকে সামরিকভাবে পরাজিত করা কোনো সাধারণ বা স্বাভাবিক যুদ্ধ কৌশলের মাধ্যমে সম্ভব নয়। ফলে ইরানের টিকে থাকার লড়াইয়ের সাথে এখন সরাসরি জড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক মর্যাদা এবং ইসরায়েলের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।
সংকটের মূলবিন্দু: যখন একটি দেশের অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে পড়ে, তখন আন্তর্জাতিক আইন বা নিষেধাজ্ঞা আর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ইরানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় এবং চূড়ান্ত তাসটি হলো—পরমাণু অস্ত্র। নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চরম প্রয়োজনে ইরান যেকোনো সময় পরমাণু পরীক্ষা চালিয়ে বসতে পারে, এমন আশঙ্কা এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়। যখন কোনো জাতি দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তখন পরমাণু প্রতিবন্ধকতাই হয়ে ওঠে তাদের চূড়ান্ত সুরক্ষাকবচ।
বিশ্ব এখন গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে যে, এই অমীমাংসিত যুদ্ধের শেষ পরিণতি কী হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমাগত চাপ কি ইরানকে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে? যদি তা-ই হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যকে চিরতরে বদলে দেবে। বিশ্বনেতৃত্ব যদি এখনই কোনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করতে না পারে, তবে এক অপ্রত্যাশিত পরমাণু পরীক্ষার মাধ্যমে এই অঞ্চল এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হতে পারে।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা
শিক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক









