ক্যাম্পাসের যে করিডোরগুলোতে কিছুদিন আগেও তোমাদের হাসির রোল উঠত, নোট আদান-প্রদানের ব্যস্ততা থাকত, আজ সেখানে এক অদ্ভুত শূন্যতা। আর বাইরে তাকালে দেখি, পিচঢালা তপ্ত রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছ তোমরা। তোমাদের দাবি, তোমাদের ক্ষোভ, তোমাদের অনিশ্চয়তার কথা আমি বুঝতে পারি। একজন শিক্ষক হিসেবে তোমাদের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আমার বুকেও এসে আঘাত করে। কিন্তু যখন দেখি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টায় তোমরা পড়ার টেবিল ছেড়ে রাজপথে দাঁড়িয়ে আছো, তখন কলম না ধরে থাকতে পারলাম না। এটি কোনো নির্দেশ নয়, কোনো শাসানি নয়; এ কেবলই তোমাদের এক শিক্ষকের হৃদয়ের গভীর থেকে আসা কিছু কথা।
প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, এইচএসসি জীবনটা প্রতিটি মানুষের জীবনের এক অনন্য সন্ধিক্ষণ। এটি কেবল একটি পরীক্ষা নয়, এটি তোমাদের ভবিষ্যতের ভিত্তিপ্রস্তর। এই সময়টুকু তোমাদের জীবনের সবচেয়ে সোনালি সময়। এই বয়সের আবেগ, উদ্দীপনা আর শক্তিকে যদি সঠিক জায়গায় কাজে লাগানো যায়, তবে তোমরা বিশ্ব জয় করতে পারো। কিন্তু আজ অত্যন্ত বেদনার সাথে লক্ষ্য করছি, সেই অমূল্য সময় ও শক্তি নষ্ট হচ্ছে রাজপথের ধুলোবালিতে, শিক্ষামন্ত্রী বা সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে।
আন্দোলন বা ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার সবারই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তার উপায় কী হওয়া উচিত? তোমরা দেশের সবচেয়ে সচেতন তরুণ সমাজ। তোমাদের কোনো দাবি-দাওয়া, কোনো যৌক্তিক চাওয়া থাকলে তা প্রকাশের জন্য তো সুনির্দিষ্ট মাধ্যম রয়েছে। তোমরা তোমাদের বক্তব্য সুন্দরভাবে, যুক্তি দিয়ে লিখিত আকারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করো। আলোচনার টেবিল যেখানে উন্মুক্ত, সেখানে কেন তোমরা নিজেদের মূল্যবান সময়কে রাস্তায় সঁপে দিচ্ছ?
একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখ তো, এই যে দিনের পর দিন পড়াশোনা বন্ধ রেখে তোমরা রাস্তায় কাটাচ্ছ, তাতে কার ক্ষতি হচ্ছে? দিনশেষে ক্ষতিটা কিন্তু একান্তই তোমার, তোমার পরিবারের এবং সর্বোপরি এই দেশের। রাষ্ট্র বা দেশের ক্ষতি হয়, এমন কোনো আচরণ কি তোমাদের মতো মেধাবীদের শোভা পায়? তোমরা তো ভাঙতে আসোনি, তোমরা এসেছ আগামী দিনের সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে।
“একটি জ্বলন্ত মোমবাতি যেমন নিজেকে পুড়িয়ে আলো দেয়, তেমনি ছাত্রজীবন হলো নিজেকে সঁপে দিয়ে জ্ঞান অর্জনের সময়। এই আলো যদি ঝড়ের মুখে পড়ে নিভে যায়, তবে চারপাশ অন্ধকারে ছেয়ে যাবে।”
মনে রেখো, আবেগমাখা এই বয়সে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব সহজ। কিন্তু ক্ষণিকের উত্তেজনায় করা ছোট্ট একটি ভুল তোমার পুরো জীবনকে ক্ষতির গহীন অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে পারে। একটি আইনি জটিলতা, একটি দুর্ঘটনা কিংবা পড়াশোনার এই ছন্দপতন—তোমাদের সুন্দর ভবিষ্যৎকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যে মা-বাবা বুকভরা আশা নিয়ে তোমাদের দিকে চেয়ে আছেন, তাদের স্বপ্নগুলোকে এভাবে মাঝপথে ভেঙে যেতে দিও না।
রাজনীতি বা নীতিগত পরিবর্তনের জন্য পুরো জীবন পড়ে আছে। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষার এই নির্দিষ্ট সময়টি চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসবে না। সময় নদীর স্রোতের মতো, যা একবার বয়ে গেলে আর ফেরানো যায় না।
তাই তোমাদের প্রতি আমার আকুল আবেদন—রাস্তার উত্তাপ ছেড়ে তোমরা তোমাদের চেনা পড়ার টেবিলে ফিরে যাও। বইয়ের পাতাগুলো তোমাদের ডাকছে। কলমের কালিতে তোমাদের ভাগ্য লেখার সময় এখনই। আবেগকে নিয়ন্ত্রণে এনে বিবেককে জাগ্রত করো। পড়াশোনায় পূর্ণ মনোযোগ দাও। নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলো যেন আগামী দিনে তোমরাই পারো এই দেশের নীতি নির্ধারণ করতে, যেন তোমাদের কোনো দাবির জন্য আর কখনো রাস্তায় দাঁড়াতে না হয়।
তোমাদের সুন্দর, নিরাপদ এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কামনায়—সবসময় তোমাদের পাশে থাকা একজন শিক্ষক।
মোঃ মহিউদ্দিন
শিক্ষক এবং বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা
শিক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক









