কে,এম,তোফাজ্জেল হোসেন সিনিয়র ষটাফ রিপোর্টার | কুষ্টিয়া (খোকসা) কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলায় উন্নয়নের নামে নির্মিত হচ্ছে এক বিতর্কিত সড়ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের মাঝখানে বৈদ্যুতিক খুঁটি রেখেই প্রায় সাড়ে প্রশস্ত ও সংস্কারের কাজ চলছে। শুধু তাই নয়, একটি খালের সুইচগেট এবং একাধিক বক্স কালভার্টের গাইড ওয়াল মাটির নিচে ঢেকে দিয়ে রাস্তা উঁচু করায় পুরো সড়কটি এখন সাধারণ মানুষের কাছে ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ এবং সম্ভাব্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে,খোকসা উপজেলার ১০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করে উপজেলা সদর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বিভিন্ন বাজারে যাতায়াত করেন। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে দুর্ভোগ পোহানোর পর এলাকাবাসী নতুন রাস্তার আশায় ছিলেন। কিন্তু নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আরসিআইপি (RCIP) প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি সংস্কার ও প্রশস্তকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স কার্যাদেশ পাওয়ার পর কমলাপুর-একতারপুর জিসি রোড, বহরমপুর-বনগ্রাম ভায়া কাতলাগাড়ি ঘাট এবং চাঁদট-বনগ্রাম বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে কাজ শুরু করে।
প্রথমদিকে রাস্তার বড় অংশজুড়ে প্রায় তিন ফুট চওড়া ও দুই ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে দীর্ঘ সময় ফেলে রাখায় এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েন। পরে রাস্তা নির্মাণের কাজ এগোতে থাকলেও নতুন করে দেখা দেয় বৈদ্যুতিক খুঁটি নিয়ে জটিলতা। স্থানীয়দের দাবি, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সম্প্রতি নতুন বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের সময় প্রায় ১১৫টি খুঁটি এমনভাবে স্থাপন করে, যা বর্তমানে প্রশস্ত করা রাস্তার ভেতরে পড়ে গেছে। অথচ এসব খুঁটি অপসারণ না করেই রাস্তার নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ফলে রাস্তার একাধিক স্থানে বৈদ্যুতিক খুঁটি এখন চলাচলরত যানবাহনের জন্য সরাসরি প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে বা কুয়াশার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
শুধু বৈদ্যুতিক খুঁটি নয়, চাঁদট খালের উৎসমুখের সুইচগেট এবং একাধিক বক্স কালভার্টের গাইড ওয়াল মাটির নিচে ঢেকে দিয়ে রাস্তা উঁচু করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এতে খালের অবস্থান বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সামান্য অসাবধানতা বা গাড়ি সাইড দিতে গিয়ে কোনো যানবাহন সরাসরি গভীর খালে পড়ে যেতে পারে।
বনগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাসেল উদ্দিন বলেন, রাস্তার তিন থেকে চার ফুট ভেতরে অসংখ্য বৈদ্যুতিক খুঁটি রেখেই কাজ করা হয়েছে। বিষয়টি ঠিকাদারকে জানানো হলেও তারা গুরুত্ব দেননি। তিনি আরও বলেন, রাস্তা এতটাই উঁচু করা হয়েছে যে কোথায় সুইচগেট, কোথায় কালভার্ট—তা বোঝা যায় না। এটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
বনগ্রাম পশ্চিমপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, কাজের সময় গ্রামবাসী খুঁটি রেখে রাস্তা নির্মাণে বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের কথা কেউ শোনেনি। এখন কৃষিপণ্য বোঝাই গাড়ি কিংবা অটোভ্যান চলাচলে চরম সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, খালের পাশের দেয়ালও মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। কেউ ভুল করলেই ২০ থেকে ২৫ হাত গভীর খালে পড়ে যেতে পারে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাস্তার নির্মাণমান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ম্যাকাডাম স্তরের কাজ শেষ হলেও অনেক স্থানে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে শুধু কার্পেটিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে কোটি টাকার এই প্রকল্প বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্সের প্রতিনিধি আব্দুল হালিমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
খোকসা এলজিইডির কার্যসহকারী সাইদুল ইসলাম বলেন, রাস্তার ভেতরে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এদিকে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাজু আহমেদ জানান, রাস্তার মাঝখানে থাকা পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি সরানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি আরও বলেন, খালের সুইচগেট ও বক্স কালভার্টের গাইড ওয়াল ঢেকে যাওয়ার বিষয়টি তার জানা নেই। যদি সত্যিই এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মানুষের জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে কোনো উন্নয়নকাজ গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ করার আগে সড়কের ভেতরে থাকা সব বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণ, খাল ও কালভার্টের গাইড ওয়াল দৃশ্যমান করা এবং নির্মাণকাজের মান পুনরায় যাচাই করা হোক। অন্যথায় এই সড়ক যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
উন্নয়নের নামে যদি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তবে সেই উন্নয়ন জনগণের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। খোকসার এই সড়ক এখন সেই বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
Post Views: 125
Related