গণমাধ্যমের মূল কাজ হলো রাষ্ট্রের অপশাসন, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক স্বৈরাচারকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের মাধ্যমে জনগণের সামনে উন্মোচিত করা। কিন্তু যখন কোনো সংবাদ কিংবা প্রতিবেদন বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত চটকদার ও আক্রমণাত্মক শব্দচয়ন দিয়ে তৈরি হয়, তখন তা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা না হয়ে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ ও চরিত্রহননের হাতিয়ারে পরিণত হয়। সম্প্রতি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত “শিক্ষায় ঘুষের হাট: ডিজির নেতৃত্বে সারাদেশে বদলি বাণিজ্যের দালাল নেটওয়ার্ক” শিরোনামের প্রতিবেদনটি এমনই এক অপসাংবাদিকতার জ্বলন্ত উদাহরণ।
১. প্রমাণের অনুপস্থিতি ও চাঞ্চল্যকর শব্দচয়ন:
প্রতিবেদনটির শিরোনামেই “ঘুষের হাট”, “ডিজির নেতৃত্বে”, “দালাল নেটওয়ার্ক”-এর মতো গুরুতর কিছু অভিযোগ এনে একধরনের বিচারিক রায় দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যমের প্রাথমিক নিয়ম হলো—যেকোনো গুরুতর অভিযোগের সপক্ষে সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য তথ্য-প্রমাণাদি উপস্থাপন করা। প্রতিবেদনে ডিজির (মহাপরিচালক) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ, অর্থ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কিংবা কোনো অডিও-ভিডিও রেকর্ডের উল্লেখ পাওয়া যায় না। কেবলই “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র”, “একটি বিশেষ চক্র” বা “অভিযোগ রয়েছে”—এ জাতীয় অনির্দিষ্ট ও ধোঁয়াসাপূর্ণ বাক্যের ওপর ভিত্তি করে পুরো গল্পটি ফাঁদা হয়েছে।
২. একপাক্ষিক উপস্থাপন ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া:
পেশাদার সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিগুলোর অন্যতম একটি হলো—যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তার বক্তব্য গ্রহণ করা এবং প্রতিবেদনে তা সততার সঙ্গে প্রকাশ করা। কোনো একজন প্রশাসনিক শীর্ষ কর্মকর্তা বা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মতো সংস্থাকে কেন্দ্র করে যখন “বাণিজ্যের দালাল নেটওয়ার্কের প্রধান” হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়, তখন অভিযুক্ত ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট জবাব ও ব্যাখ্যা সেখানে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক। প্রতিবেদনটিতে অভিযোগের সত্যতা যাচাই বা অভিযুক্ত কর্তৃপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনে যে চরম উদাসীনতা দেখা গেছে, তা সংবাদটির নিরপেক্ষতাকে সম্পূর্ণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা হানি ও প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা:
শিক্ষা খাতের মূল প্রশাসনিক চালিকাশক্তি হলো মাউশি এবং এর মহাপরিচালকের দপ্তর। সারা দেশের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নে একটি নির্দিষ্ট সরকারি বিধিমালা ও ডিজিটাল প্রক্রিয়া কার্যকর থাকে। প্রশাসনিক কোনো ফাঁকফোকর বা অনিয়ম থাকলে তা সুনির্দিষ্ট স্থান, তারিখ ও ঘটনার উল্লেখসহ তুলে ধরাই একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কাজ। কিন্তু ভিত্তিহীন ও ঢালাওভাবে “ডিজির নেতৃত্বে ঘুষের হাট” বলে সংবাদ পরিবেশন করলে কেবল ওই ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটে না, বরং পুরো শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরেই বিভ্রান্তি ও অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ে।
৪. ‘ক্লিকবেইট’ সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার নৈতিকতার অবক্ষয়:
বর্তমান ডিজিটাল যুগে কিছু অনলাইন পোর্টাল সত্যতা যাচাইয়ের চেয়ে সস্তা পাঠকপ্রিয়তা বা ‘ভিউ-ক্লিক’ পাওয়ার প্রতিযোগিতাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। চাঞ্চল্যকর শিরোনাম তৈরি করে পাঠককে আকৃষ্ট করার এই অশুভ প্রবণতা সংবাদমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা দিন দিন কমিয়ে দিচ্ছে। একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম কখনই তথ্যের ভিত্তি ছাড়া রূপকথার গল্পের মতো প্রশাসনিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের জড়িয়ে সংবাদ পরিবেশন করতে পারে না।
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের অবস্থান থাকা অত্যন্ত জরুরি, তবে তা হতে হবে সত্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ। মনগড়া তথ্যের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ‘সাংবাদিকতা’-কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা প্রেস কাউন্সিলের নীতিমালার চরম লঙ্ঘন। শিক্ষা খাতের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে মনগড়া ও চটকদার খবর পরিবেশনের সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনই পারে গণমাধ্যমের হারানো গৌরব ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা,
শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক।









