মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং একটি সুদক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা যেকোনো উন্নত রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষা প্রশাসনের তদারকির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে দেশসেরা মেধাবীদের মধ্য থেকে এই ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নির্বাচন করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয়করণ বা আত্তীকৃত সরকারি কলেজের নন-ক্যাডার শিক্ষকদের ঢালাওভাবে ক্যাডার পদমর্যাদা দেওয়ার যে দাবি বা আইনি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার গঠনের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক নয়, বরং সার্বিক শিক্ষা প্রশাসনের গুণগত মানকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থার গতিশীলতা ও স্বকীয়তা বজায় রাখতে এই প্রক্রিয়ার একটি যৌক্তিক ও স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের দাবি।
ক্যাডার সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভিন্নতা:
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) গঠনের মূল দর্শন হলো একটি মেধাকেন্দ্রিক, নিরপেক্ষ এবং দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা। বিশেষ করে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা নয়; বরং বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের প্রশাসনিক পদ, শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিএসএইচই), জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরসহ (ডিআইএ) জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষা নীতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দেওয়া।
অন্যদিকে, বেসরকারি কলেজগুলো যখন এমপিওভুক্ত ছিল বা ব্যক্তি কমিটির অধীনে পরিচালিত হতো, তখন সেখানকার নিয়োগ প্রক্রিয়া মোটেও বিসিএস পরীক্ষার মতো কঠোর, স্বচ্ছ বা জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় পরিচালনা পর্ষদ (গভর্নিং বডি) কর্তৃক স্বকীয় মানদণ্ডে এসব নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে, যা মানগত দিক থেকে পিএসসি-র যাচাই-বাছাইয়ের চেয়ে বহুগুণ পিছিয়ে। ফলে কোনো ধরনের প্রমিত যাচাই বা প্রতিযোগিতা ছাড়া শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠান সরকারি হওয়ার সুবাদে সেখান থেকে রাতারাতি ‘ক্যাডার’ মর্যাদা পেয়ে যাওয়া মেধাভিত্তিক সিভিল সার্ভিসের মৌলিক নীতির সরাসরি পরিপন্থী।
শিক্ষা প্রশাসনে দক্ষতার ঘাটতির আশঙ্কা:
একজন কর্মকর্তা যখন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অংশ হন, তখন তিনি প্রশাসনিক নীতিনির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনার বিস্তৃত প্রশিক্ষণ পান। আত্তীকৃত শিক্ষকরা যদি স্বয়ংসক্রিয়ভাবে বা কোনো আদালতের রায়ের প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতায় ক্যাডার মর্যাদা পেয়ে যান, তবে তারা প্রশাসনিক সর্বোচ্চ পদগুলোতে বসার যোগ্যতা ও অধিকার লাভ করেন। যাদের মৌলিক নিয়োগে প্রতিযোগিতামূলক মেধার ঘাটতি থাকতে পারে, তাদের হাতে জেলা, অঞ্চল বা জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব অর্পিত হলে সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিক্ষানীতি প্রণয়ন, পরীক্ষা পরিচালনা এবং শিক্ষকদের তদারকিতে অনভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার ঘাটতি পুরো ব্যবস্থাকে স্থবির করে তুলতে পারে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত ও দ্বিমুখী নীতির বৈষম্য:
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যখনই কোনো সরকারি কলেজ পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে (যেমন—জগন্নাথ কলেজ থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর), তখন বিসিএস ক্যাডারভুক্ত সরকারি শিক্ষকদের কখনোই সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে রেখে দেওয়া হয়নি। ক্যাডারের নিজস্ব রীতিনীতি ও আইনি মর্যাদা বজায় রেখে সেই শিক্ষকদের অন্যান্য সরকারি কলেজে ফিরিয়ে নেওয়া বা বদলি করা হয়েছে। সরকারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে যদি এই নিয়ম প্রযোজ্য হয়, তবে বেসরকারি কলেজের ক্ষেত্রে কেন বিপরীত নীতি গ্রহণ করা হবে?
একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হওয়া এবং নিজের চাকরি স্থায়ীকরণ হওয়াটাই ওই শিক্ষকের জন্য এক বিরাট সামাজিক ও পেশাগত সৌভাগ্য। কিন্তু সেখানেই থেমে না থেকে যদি রাতারাতি তাদের ক্যাডার মর্যাদায় উন্নীত করার দাবি ওঠে, তবে তা বিসিএস ক্যাডারের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
দক্ষতা অর্জন ও পেশাগত সম্মান নিশ্চিতের পথ:
প্রতিষ্ঠান সরকারি হলে বা জাতীয়করণ করা হলে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কল্যাণ ও চাকরির নিরাপত্তা সুসংহত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু তাই বলে তাদের ক্যাডারভুক্ত করাই একমাত্র সমাধান হতে পারে না।
প্রকৃতপক্ষে, প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের পর বেসরকারি আমলের শিক্ষকদের হয় অন্য কোনো বেসরকারি কলেজে স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, অথবা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (NTRCA) অধীনে নিয়োগপ্রাপ্তদের তাদের নিজ ধারার পদায়নের ব্যবস্থা করাই শ্রেয়। আর যদি সরকারিকরণের কারণে তাদের সেই প্রতিষ্ঠাতেই ধরে রাখতে হয়, তবে তাদের জন্য বিসিএস ক্যাডারের বাইরে একটি ‘স্বতন্ত্র অর্গানোগ্রাম’ বা ‘বিশেষ নন-ক্যাডার অবকাঠামো’ তৈরি করা উচিত। তাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সরকারি স্কেলে উন্নীত হোক, কিন্তু ক্যাডার মর্যাদা ও ক্যাডার নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক পদে পদায়নের সুযোগ কেবল বিসিএস উত্তীর্ণদের জন্যই সংরক্ষিত রাখা যুক্তিসঙ্গত।
ক্যাডারের পরিধি সম্প্রসারণ এবং সামাজিক মর্যাদার অবক্ষয়:
যেকোনো প্রশাসনিক ক্যাডারের গৌরব ও মান নির্ভর করে তার কাঠামোগত সান্দ্রতা ও কাঠিন্যের ওপর। হাজার হাজার আত্তীকৃত শিক্ষককে কোনো প্রমিত পরীক্ষা ছাড়া ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করলে ক্যাডারের আয়তন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিসিএস ক্যাডারের সামাজিক মর্যাদা, কর্মস্পৃহা ও মানের ওপর। সরাসরি বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে আসা তরুণ মেধাবীরা যখন দেখবেন যে, কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়া পদার্পণ করা ব্যক্তিরা তাদের সিনিয়র হিসেবে প্রশাসনিক চেয়ারে আসীন হচ্ছেন, তখন তাদের পেশাগত অনুপ্রেরণায় চরম ধস নামবে। এটি সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থার ভেতরে এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ ও প্রশাসনিক জটলা তৈরি করবে।
পরিশেষে বলা যায় যে, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হলে আবেগ বা সাময়িক আইনি বাধ্যবাধকতার উর্ধ্বে উঠে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাষ্ট্রকে পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, ‘প্রতিষ্ঠান সরকারি করা’ আর ‘শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্ত করা’ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। জাতীয়করণ হওয়া কলেজের শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা ও সরকারি স্কেলের সুবিধা প্রদান অবশ্যই একটি মানবিক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ, তবে সেটিকে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কাঠামোর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা মারাত্মক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। শিক্ষা ক্যাডারের মেধাভিত্তিক ঐতিহ্য ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার স্বার্থে অবিলম্বে পৃথক অর্গানোগ্রাম গঠন করে আত্তীকৃত শিক্ষকদের নন-ক্যাডার হিসেবেই বিন্যস্ত করা উচিত। তবেই মেধার যথোপযুক্ত মূল্যায়ন হবে এবং জাতীয় শিক্ষা প্রশাসনের গুণগত মান অক্ষুণ্ন থাকবে।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা),
শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক।









