রংপুর ব্যুরো:
রংপুর মহানগরী মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। কোনো রাখঢাক না করেই প্রকাশ্যই বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেন্সিডিলসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য। সহজলভ্যতার কারণে সর্বনাশা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থী ও যুব সমাজসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। এমনকি স্কুলপড়–য়া ছেলেরাও মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। প্রশাসনের তৎপরতা থাকলেও তা অনেকটাই দেখানো বলে অভিযোগ করেছে অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ। মহানগরীর ব্যস্ততম এলাকা পায়রা চত্বরে শত শত যানবাহন ও মানুষের সামনে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের একটি ভিডিও স¤প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে রংপুরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের প্রতিরোধের ভ‚মিকা নিয়ে। একইভাবে সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ের সামনে ওভারব্রীজের ওপরেও মাদক সেবীদের অবস্থান ও মাদকের জমজমাট ব্যবসা চলছে বলে জানা গেছে।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা যায়, রংপুর নগরীর সিটি বাজার এলাকা, জেলা পরিষদ সুপার মার্কেট, পায়রা চত্বর, জাহাজ কো¤পানি মোড়, প্রেসক্লাবের আশপাশের এলাকা, শাপলা চত্বর, খামার মোড় ও লালবাগ এলাকায় ফেরি করে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা ও হেরোইন। অন্যদিকে স্টেশন, আলমনগর কলোনি, বাবুপাড়া, আকাশ সিনেমা হলের আশপাশের গলিতে প্রকাশ্যে বিক্রি হয় ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক। ইয়াবা কাগজে মুড়িয়ে নিয়ে বহন করলে বোঝার উপায় থাকে না। তবে মাদকসেবীরা ঠিকই বুঝতে পারে কারা বিক্রেতা। একই অবস্থা নগরীর আধুনিক মোড়ের আশপাশে, দর্শনা মোড়, ধাপ মোড়, কলেজ মোড়, সিও বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায়। যেখানে রীতিমতো ফেরি করে মাদক বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া নগরীর বেশিরভাগ পাড়া-মহল্লায় নির্দিষ্ট কিছু আস্তনায় মাদক ব্যবসা চলছে রমরমাভাবে। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এলাকার মাস্তান ও রাজনৈতিক দলের লেবেল লাগানো ব্যক্তিদের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতা রয়েছে বলে অভিযোগ। আশরাফুল আলম নামে এক শিক্ষক বলেন, যারা গ্রেফতার হচ্ছে, তারা খুচরা মাদক কারবারি। কিন্তু যারা মাদক কারবারির গডফাদার, যারা বড় বড় চালানের মাধ্যমে মাদক এনে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করে,তাদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। ফলে মূল রুট বন্ধ করতে না পারলে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। রহমান আলী নামে এক চাকরিজীবী বলেন, রংপুর এখন মাদকের করাল গ্রাসে বন্দি। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হচ্ছে মাদক করা হয়। একই সঙ্গে গ্রেফতার হচ্ছে মাদক কারবারিরা।
কিন্তু এত অভিযানের পরও কেন বানের পানির মতো ভেসে আসছে মাদক? কেন সহনীয় পর্যায়ে আনা যাচ্ছে না? পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থী মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধের দাবি জানায়। রোস্তম আলী নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, মাদকদ্রব্য রংপুর নগরী গ্রাস করে ফেলেছে। আমরা সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। শিক্ষার্থী ও তরুণদের অভিযোগ, হাত বাড়ালেই রংপুর নগরীতে মেলে মাদক। এমন সহজলভ্যতার কারণেই মাদকের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। সর্বনাশা মাদকের গডফাদারদের গ্রেফতার না করা গেলে যুব সমাজকে মাদকের আসক্তি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। রংপুর নগরী থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ পৌর এলাকার তিস্তা নদীর চরাঞ্চলের মচক টাংরি বাজার, চর মিলন বাজারসহ আশপাশের চরাঞ্চলেও প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। রংপুর নগরী থেকে মোটরসাইকেলে গিয়ে ফেন্সিডিল ক্রয় করে সেবন করছে মাদক সেবীরা।
ওই এলাকা পাশ্ববর্তী লালমনিরহাট জেলা ও ভারতীয় সীমান্ত এলাকা হওয়ায় নদীপথে আসছে ইয়াবাসহ মাদকের চালান। হারাগাছ পৌর এলাকার মায়াবাজার, পাইকার বাজার ও হক বাজারেও রীতিমতো মাদক বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল মাবুদ স¤প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বলেন, আমরা মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছি। সেই ভাবেই অভিযান চলছে। তবে মাদক নির্ম‚লে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপরও জোর দিচ্ছি। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবির উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, মাদক কারবারিদের গ্রেফতার করতে সব সময় অভিযান চলছে। তিনি জনগণকে আরও সচেতন হওয়ার আহŸান জানান। তবে সাধারণ মানুষ বলেন, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। মাদকের সরবরাহ চক্র ভেঙে স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। সচেতন মহল মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি অভিভাবকদেরও আরও সচেতন হতে হবে।








