সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ,
বাংলাদেশের ১৫ লক্ষাধিক চা—জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানবেন!
আপনারা অবগত আছেন যে, বাংলাদেশের ১৭০টি চা বাগানে প্রায় ১৫ লক্ষ চা জনগোষ্ঠী ১৮০ বছর ধরে বসবাস করছে। ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজরা ভারতের বিহার, মাদ্রাজ, উত্তর প্রদেশ, উড়িষ্যাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় ১১৬টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আজীবন কাজের শর্তে চুক্তিবদ্ধ করে এ দেশে নিয়ে আসে। সেই চুক্তির শৃঙ্খল ছিন্ন হয়নি আজও। তারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
চা শিল্প বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অথচ এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি—এই দেশের চা শ্রমিকরা—আজও কম মজুরিতে অতি—দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ—”নিজভূমে পরবাসী”।
চা শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতি:
দারিদ্র্য ও মজুরি: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দৈনিক ১.৯১ ডলার (২৩১ টাকা)—এর কম আয়কে অতি—দারিদ্র্য বলা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একজন চা শ্রমিক ৩৫০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। এই বৈষম্যমূলক মজুরিতে বাড়তে থাকা দ্রব্যমূল্যের সাথে তাল মিলিয়ে বাঁচা তাদের পক্ষে অসম্ভব। তবুও এই চা শ্রমিকদের দারিদ্র্যের বিষয়টি চজঝচ বা সপ্তম পঞ্চ—বার্ষিকী পরিকল্পনার কোথাও উল্লেখ করা হয়নি—যার ফলে তারা সমন্বিত উন্নয়নের সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।
শিক্ষা: ১৭০টি চা বাগানের মধ্যে একটি বাগানেও কোনো কলেজ নেই। হাই স্কুল আছে মাত্র ৯টি, সেগুলোও সীমিত সম্পদে চা বাগানের ছাত্র—যুবকদের দ্বারা পরিচালিত। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে হাতে গোনা কয়েকটি। ৫—৬ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হয় শিশুদের। ভাষাগত ও শারীরিক পার্থক্যের কারণে মূলধারার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বৈষম্য ও লাঞ্ছনার শিকার হয়ে তারা প্রাথমিক পাঠ শেষ হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। পিছিয়ে পড়া অন্যান্য জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও চাকরিতে কোটা থাকলেও চা জনগোষ্ঠীর জন্য তেমন কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেই।
স্বাস্থ্যসেবা: অধিকাংশ চা বাগানে হাসপাতাল নেই। যেখানে আছে, সেখানে ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই। প্রশিক্ষিত ধাত্রীর অভাবে মাতৃমৃত্যুর হার ক্রমশ বাড়ছে। যক্ষ্মা, টাইফয়েড, রক্তশূন্যতা, ডায়রিয়া চা শ্রমিকদের নিত্যসঙ্গী। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় নলকূপ স্থাপন ব্যয়বহুল বলে অধিকাংশ শ্রমিক গাং বা ঝরনার পানি পান করতে বাধ্য হয়।
বাসস্থান: চা বাগানের বেশির ভাগ চা—শ্রমিক পরিবার ৮/১২ ফুট মাপের একটি ঘরে অন্তত তিনটি প্রজন্ম বাস করে; যা পুরো মানব সভ্যতার জন্য লজ্জাজনক। একটি ঘরে তিন প্রজন্ম বাস করা যেমন অস্বাস্থ্যকর তেমনি মানহানিকর ওই ঘরের সবার জন্য, সমাজের জন্য তো বটেই। এতে করে বাগানের শিশুদের আত্মসম্মান ও মানসিক বিকাশ হচ্ছে না।
ভূমি অধিকার: চা—শ্রমিকরা প্রজন্মনের পর প্রজন্ম চা—বাগানে বসবাস করলেও তারা তাদের বসতভিটার মালিকানা পায়নি। তারা যেন নিজ ভূমে পরবাসী। চা চাষের জন্য সরকার কর্তৃক ১,১১,৬৬৩.৮৩ হেক্টর জমি লিজ মঞ্জুর হয়েছে, একর প্রতি বার্ষিক লিজ মাত্র ৫০০ টাকা। অথচ চা শ্রমিকদের নিজেদের ভূমির কোনো দলিল নেই। ফলে তারা ব্যাংক ঋণ পায় না, নিজেদের ঘর বাড়াতে পারে না এবং প্রভাবশালীদের ভূমি দখলের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পায় না। চান্দপুর—বেগমখান চা বাগানের ১,২৫০টি পরিবারের ৫১১.৮৩ একর কৃষিজমি দখল করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করার চেষ্টা চলছে। চলাখাই চা বাগানের ৭০টি পরিবারের ১০০ একর জমি দখল করা হয়েছে। লাক্কাতুরা চা বাগানের শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ না দিয়েই তাদের জমিতে নির্মিত হয়েছে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম।
শ্রম আইনের লঙ্ঘন: বাংলাদেশ শ্রম আইন (অধ্যায় ২, ধারা—৫) অনুযায়ী নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও কোনো চা শ্রমিককে নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। আইন অনুযায়ী ৩ মাস কাজের পর স্থায়ীকরণের বিধান থাকলেও প্রায় ২,৫০,০০০ শ্রমিক সারাজীবন কাজ করেও স্থায়ী হচ্ছে না।
৫% ইনক্রিমেন্টের অযৌক্তিক গেজেট বাতিল করে চা—শ্রমিকদের মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ, ভূমি অধিকার নিশ্চিত করণসহ আমাদের ১১ দফা দাবিসমূহ:
১.চা শ্রমিকদের মজুরি কমপক্ষে ৫০০ টাকা নিশ্চিত করা;
২.২ . চা জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা;
৩.শ্রম আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র প্রদান করা ও ৩ মাস পর স্থায়ীকরণের বিধান কার্যকর করতে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা এবং আইন লঙ্ঘনকারী বাগান মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া;
৪.প্রতিটি চা বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চা বাগান অঞ্চলে উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করা;
৫.প্রতিটি চা বাগান ক্লাস্টারে কমপক্ষে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করুন, যেখানে থাকবে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, ধাত্রী, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নলকূপ বা পানি শোধনাগার স্থাপন করা;
৬.চা শ্রমিকদের জন্য মানসম্মত আবাসন নির্মাণে সরকারি—বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি বিশেষ আবাসন প্রকল্প চালু করা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
৭.চা বাগানের ১১৬টি জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ তাদের বৈচিত্র্যময় ভাষা, সংস্কৃতি, লোকশিল্প, উৎসব ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি “চা জনগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি” প্রতিষ্ঠা করা;
৮.জাতীয় বাজেটে চা জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ এবং এই অর্থের ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন মনিটরিং কমিটি গঠনে উদ্যোগ গ্রহণ করা;
৯.বেকার যুব সমাজের দক্ষতা উন্নয়ন, আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ চা বাগানের বহুমাত্রিক সমস্যা সমাধানে একটি পূর্ণাঙ্গ “চা শ্রমিক উন্নয়ন একাডেমি” স্থাপন ও একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা;
১০.শ্রম আইনের ৩২(১) ধারাসহ চা শ্রমিকস্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক সকল ধারা—উপধারা সংশোধন করুন। আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে চা বাগান পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং শ্রমিকদের আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য বিশেষ আইনি সেবা চালু করা;
১১.জাতীয় গণশুমারিতে চা জনগোষ্ঠীকে পরিচয়ভিত্তিকভাবে পৃথকভাবে গণনা ও স্বীকৃতি প্রদান করা, আমাদের প্রকৃত সংখ্যা, অবস্থান ও প্রয়োজন নির্ভুলভাবে জানা যায় এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় আমরা অন্তর্ভুক্ত হই।
বাংলাদেশের ১৫ লক্ষ চা জনগোষ্ঠীর পক্ষে—
মোহন রবিদাস, চা শ্রমিক সন্তান-








