প্রায় সবারই জ্বিন বিষয়ক ভুল ধারণা আছে। এমন বিষয়ে ভুল ধারনা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। ইনশা-আল্লাহ ; আজকের আপনার সেই ভুল ধারণা দূর করবো।
১৯৮৭ সালের আশেপাশে কোন এক সময়ে ; আমি তখন হাই-স্কুলের ছাত্র। সেই প্রথম টেলিভিশনের রিমোট কন্ট্রোল দেখেছিলাম। জিনিসটা দেখে আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম। কোন রকম সংযোগ ছাড়াই, ওটা কিভাবে টেলিভিশনকে নিয়ন্ত্রণ করে !! ব্যাপারটা আমার কাছে যাদুর মতন মনে হয়েছিলো।
বিশ্বের প্রথম Audio Player, যন্ত্র ছিলো – Gramophone। ১৯৫০ সালে, আমার বাবা বালক বয়সে সেই গান গাওয়া যন্ত্র দেখে খুবই অবাক হয়েছেলেন। তারা কয়েজন বালক মিলে সিদ্ধান্তে পৌছেছিলেন, ওটা নিশ্চয়ই যাদুর যন্ত্র হবে। ওর ভেতরে হয়তো মানুষের মাথা রাখা আছে, যেটা গান গায়।
আচ্ছা, প্রশ্নটি হলো “জ্বীন” এর ব্যাপারে। এর মধ্যে এসব লিখছি কেন?
যাদু বোঝানোর জন্য। ৪০ বছর আগে, টিভির রিমোট জিনিসটা অবিশ্বাস্য ছিলো, যাদুর মতন ছিলো। ৭০ বছর আগে, অডিও রেকর্ড জিনিসটা অবিশ্বাস্য ছিলো, যাদুর মতন ছিলো। সেই যুগের তুলনার, আপনার আজকের সময়টা তুলনা করে দেখুন। স্মার্ট-ফোন, অনলাইন শপিং, অনলাইন ব্যাংকিং, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এসব কতখানি অবিশ্বাস্য, কত বেশী যাদু, সেটা বুঝতে পেরেছেন?
আমরা আসলে, একটি যাদুর যুগে বসবাস করছি। সেটা বোঝানোর জন্যই, উপরের এই বিষয়গুলো লিখতে হয়েছে।
আল্লাহর বিশেষ দুটি সৃষ্টি হলো। মানুষ এবং জ্বীন বিশেষ হবার কারন হলো – এই দুটি প্রজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে ইবাদত করানোর জন্য।
- জ্বীন ও মানুষকে আমি শুধু এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত (দাসত্ব) করবে। (সুরা জারিয়াত – ৫৬)
দুনিয়াতে, আল্লাহর লক্ষ কোটি সৃষ্টি আছে। এমনকি আসমানে অগনিত ফেরেশতা আছে। তাদের কাউকে ইবাদত করানোর জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। জ্বীন ও মানুষ, এই দুটি প্রজাতিকে ইবাদত করানোর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
সম্ভবত সেই কারনেই, এই দুটি জীব, অন্যান্য জীব থেকে আলাদা। কেমন আলাদা? তারা নিজেদের জন্য আলাদা জগত বানিয়ে নিয়েছে। গাছ-পালা, নদী-নালার দুনিয়াতে থেকেও, মানুষ নিজের জন্য শহর বানিয়েছে। সেখানে প্রযুক্তি দিয়ে,যাদুর মতন পরিবেশ বানিয়েছে। পশুপাখি, আল্লাহর দেওয়া সেই জঙ্গলেই রয়ে গেছে। মানুষ, নিজের জগত, শহর বানিয়ে নিয়েছে ; প্রযুক্তির যাদুকরী ব্যাবহার শুরু করেছে। জ্বিন ও তাদের নিজস্ব এলাকা বানিয়াছে।
জ্বীন জাতির, মানুষের মতন অত বেশী বুদ্ধি নেই। এজন্যই হয়তো, আল্লাহ তাদেরকে বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন। তাদের প্রযুক্তির দরকার হয় না। তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন কার্যকলাপই যাদুর মতন। আপনি মোবাইল ব্যাবহার করে, হাজার কিলোমিটার দুরের বন্ধুর সাথা যোগাযোগ করতে পারেন। জ্বিনের সেই প্রযুক্তি লাগে না। তারা এমনিতেই হাজার কিলোমিটার দূরে যোগাযোগ করতে পারে।
কি বুঝলেন?
জ্বিন মানেই অসম্ভব বা ভয়ঙ্কর কোনকিছু মনে করার কারন নেই। জ্বীন একটি বিশেষ জীব। মানুষ প্রযুক্তির মাধ্যমে যাদুকরি কাজ করে। ওদিকে, জ্বীন স্বাভাবিকভাবেই যাদুকরী কাজ করতে পারে।
আপনি সুইস টিপেই, অচেনা কারো কাছে থেকে কোনকিছু কেনার জন্য অর্ডার দিতে পারেন। সুইট টিপেই টাকা লেনদেন করতে পারেন। কোন একজন অচেনা মানুষ সেই জিনিসটি আপনার বাসায় পৌঁছে দেয়। কাউকে চেনা লাগে না ; কথা বলা লাগে না। এমনকি, কাছাকাছি আসাও লাগে না। দূরে বসেই, সুইস টিপে সবকিছু করা যায়। হ্যাঁ, ওটাকে অনলাইন শপিং বলে।
জ্বীন জাতি, আপনার এই অনলাইন শপিং বোঝে না। তাদের কাছে, এটা অবিশ্বাস্য লাগে, যাদুর মতন লাগে। অথচ, আপনার কাছে এটা স্বাভাবিক বিষয়। একইভাবে, জ্বিন যখন অন্য কোন প্রানীর রুপ ধারন করে, সেটা আপনার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে, যাদুর মতন লাগে। জ্বীন যখন মুহুর্তের মধ্যে, এক স্থান থেকে আরেক স্থানে কোন জিনিস পাঠিয়ে দেয়, সেটা অবিশ্বাস্য লাগে, যাদুর মতন লাগে। অথচ ওটা জ্বীনের কাছে খুবই স্বাভাবিক বিষয়।
কি বুঝলেন?
আপনার স্বাভাবিক দৈনন্দিন কার্যকলাপ, জ্বীনের কাছে যাদুর মতন লাগে। ঠিক তেমনই, জ্বীনের দৈনন্দিন কার্যকলাপ, আপনার কাছে যাদুর মতন লাগে।
মানুষ যেমন জ্বীন জাতিকে যাদুকরী মনে করে ; সম্ভবত, জ্বীন জাতিও মানুষকে তেমন যাদুকরী মনে করে। কারন, প্রযুক্তির এই যুগে, মানুষ আসলেই যাদুর মতন কাজ করে। এক দেশে বসে, সুইস টিপে মিসাইল আঘাত করে, আরেক দেশের মানুষ মেরে ফেলে।
- মুল কথাঃ জ্বীন মানে রূপকথার গল্পের মতন অবিশ্বাস্য কিছু নয়। মানুষ ও জ্বীন, দুটি আলাদা ধরনের জীব। এমন অনেক বিষয় আছে, যেটা জ্বীন পারে, কিন্তু মানুষ পারে না। আবার, এমন অনেক বিষয় আছে, যেটা মানুষ পারে, কিন্তু জ্বীন পারে না। অযথা জ্বিনকে আশ্চর্যজনক মনে করবেন না।
প্রশ্নটি ছিলো – সুরা জ্বীনের কোন আয়াত পড়লে, জ্বীন হাজির হয়?
কোরআনের ১১৪ তম সুরা চেনেন? সুরা নাস। আরবী নাস (الناس) কথাটির অর্থ – মানুষ। অর্থাৎ, কোরআনে, যেমন সুরা জ্বীন আছে, ঠিক তেমনই, সুরা মানুষও আছে।
- এবার আপনার কাছে প্রশ্ন – সুরা নাস (মানুষ) এর কোন আয়াত পড়লে, আপনি হাজির হন?
বিষয়টা এবার বুঝেছেন তো?
সুরা নাস (মানুষ) পড়লে, কোন মানুষ হাজির হয় না। হাজির হবার কোন কারণও নেই। ঠিক তেমনই, সুরা জ্বীন পড়লে, জ্বীন হাজির হয় না। হাজির হবার কোন কারনও নেই।
তাহলে, জ্বীন হাজির হয় কিভাবে?
ঠিক যে কারনে, আপনি হাজির হন। প্রয়োজন থাকলে, আপনি কোন একটি স্থানে যান। ঠিক তেমনই, কোন একটি প্রয়োজন তৈরি করে, জ্বীনকে হাজির করা যায়। বিষয়টা কোন যাদুমন্ত্র নয়। মন্ত্রের মতন, কোরআনের আয়াত পড়ে, জ্বীন হাজির করা যায় না। কোন একটি প্রয়োজন তৈরি করে, জ্বীনকে হাজির করতে হয়।
দ্রষ্টব্যঃ
জ্বীন হাজির করাটা কোন ভালো কাজ নয়। জ্বীন ও মানুষের বাসস্থান, কিছুটা শহর ও জঙ্গলের মতন। দুটি ভিন্ন জগত, ভিন্ন পরিবেশ। জঙ্গল থেকে একটি বাঘ ডেকে এনে, শহরে ছেড়ে দিলে, কেমন হবে? অথবা, শহরের একজন মানুষকে জঙ্গলে ছেড়ে আসলে, কেমন হবে? জ্বীন ডেকে আনাটা ঠিক তেমন একটি কাজ। এমন কাজে হয়তো বাহবা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু, কোন লাভ নেই ; বরং ক্ষতির ঝুকি অনেক বেশী।









