একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রের সার্বিক মূলভিত্তি হলো তার দক্ষ, পেশাদার এবং বৈষম্যহীন জনপ্রশাসন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যে সিভিল সার্ভিস বা জনপ্রশাসন গড়ে উঠেছে, তার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো আজও এক গভীর বৈষম্যের ব্যাধিতে আক্রান্ত। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)-এ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আন্তঃক্যাডার বৈষম্য আজ কেবল প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকেই বিনষ্ট করছে না, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অর্জিত রাষ্ট্রের প্রাণকেন্দ্রে সুযোগ-সুবিধার চরম অসম বণ্টন, পদোন্নতির বৈষম্য, পদায়ন ও বদলিতে স্বজনপ্রীতি এবং রাষ্ট্রীয় রাষ্ট্রাচার বা ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’-এ নির্দিষ্ট শ্রেণির আধিপত্য গোটা সরকারি কাঠামোর ভিতকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ক. বৈষম্যের স্বরূপ: সুযোগ ও মর্যাদার অসমতা
একই পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) অধীনে একই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে, একই প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভা পার হয়ে যারা প্রজাতন্ত্রের সেবায় নিয়োজিত হন, চাকরির শুরুতে তাদের পদমর্যাদা এক হলেও সময়ের পরিক্রমায় তাদের ভাগ্যের ব্যবধান আকাশ-পাতাল হয়ে দাঁড়ায়। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা যেখানে দ্রুততার সাথে পদোন্নতি পেয়ে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে যান, সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রকৌশল, তথ্য কিংবা পুলিশসহ অন্যান্য ২৫টি ক্যাডারের কর্মকর্তারা বছরের পর বছর পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে একই পদে স্থবির হয়ে থাকেন।
এই অসমতার প্রভাব অত্যন্ত গভীর। পেশাগত জীবনে পদোন্নতির অভাব এবং সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে মারাত্মক মানসিক হতাশা সৃষ্টি করছে। পদায়নে অগ্রাধিকার, সুদমুক্ত ঋণ, গাড়ি ও আবাসন সুবিধা কিংবা প্রেষণ ভাতার মতো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাগুলোর সিংহভাগ একটি নির্দিষ্ট ক্যাডারের দখলে থাকায় অন্যান্য দক্ষ ও প্রজ্ঞাবান কর্মকর্তারা নিজেকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ বলে মনে করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে বিনষ্ট হচ্ছে কাজের পরিবেশ এবং দুর্বল হয়ে পড়ছে কর্মকর্তাদের কাজের অদম্য কর্মস্পৃহা।
খ. নীতি-নির্ধারণী পদে প্রবেশের দেওয়াল ও রুদ্ধ সম্ভাবনা
যেকোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নীতি-নির্ধারণী পদে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে পলিসি মেকিং বা সচিবালয়ের সর্বোচ্চ পদগুলোতে অন্য ক্যাডারের প্রবেশের পথ প্রায় পুরোপুরি অবরুদ্ধ। সব ক্যাডার থেকে সচিব হওয়ার পথ উন্মুক্ত তো নয়ই, বরং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল ও প্রফেশনাল সেক্টরেও পদোন্নতির সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
একজন অত্যন্ত দক্ষ চিকিৎসক বা শিক্ষাবিদ, যিনি সারাজীবন গবেষণা ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে কোটি মানুষের জীবন রক্ষা বা তৈরি করছেন, তিনি ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে গিয়েও চতুর্থ বা তৃতীয় গ্রেডের ওপরে উঠতে পারেন না। শিক্ষা ক্যাডারে অধ্যাপক পদে সর্বোচ্চ ৪র্থ গ্রেড এবং স্বাস্থ্য ক্যাডারে মাত্র গুটিকয়েক চিকিৎসকের জন্য ৩য় বা ২য় গ্রেডের সুযোগ থাকলেও গ্রেড-১ পাওয়ার পথ প্রায় পুরোপুরি রুদ্ধ। অন্যদিকে, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা অনায়াসে সচিব বা সিনিয়র সচিব হয়ে ১ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব স্তরে উন্নীত হচ্ছেন। প্রশাসনিক ও বিধিগত এই কৃত্রিম বাধা একজন বিশেষজ্ঞকে নিরুৎসাহিত করে এবং দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক পরিকল্পনা পরিচালনায় চরম পেশাদারিত্বের অভাব ঘটিয়ে দেয়।
গ. ডেপুটি সেক্রেটারি (ডিএস) পুল ও কোটাপ্রথার বৈষম্য
জনপ্রশাসনের নীতি-নির্ধারণী স্তর হিসেবে গণ্য করা হয় উপসচিব পদকে। বর্তমানে প্রজ্ঞাপন ও বিধির আড়ালে উপসচিব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের জন্য সিংহভাগ কোটা সংরক্ষিত রাখা হয়েছে, যেখানে অন্যান্য ক্যাডারের জন্য তা নামমাত্র বা বৈষম্যমূলক। একটি মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রে এ জাতীয় অগ্রাধিকার কোটা প্রথা মেধা ও পেশাদারিত্বকে পুরোপুরি নিরুৎসাহিত করে।
উপসচিব বা তদূর্ধ্ব যেকোনো নীতি-নির্ধারণী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ক্যাডারের জন্যই কোনো ধরনের অগ্রাধিকার কোটা থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত ‘মেধা ও দক্ষতা’। একমাত্র যোগ্যতার ভিত্তিতেই সরকারি প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে পদায়ন হওয়া প্রয়োজন। যদি প্রয়োজন হয়, তবে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও মেধা নিশ্চিত করতে একটি প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত কেন্দ্রীয় পরীক্ষা এবং কঠোর মূল্যায়ন পদ্ধতির ব্যবস্থা করা যেতে পারে—যার মাধ্যমে সব ক্যাডারের উপযুক্ত প্রার্থীরা সমান সুযোগ নিয়ে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে অবদান রাখার সুযোগ পাবেন।
ঘ. উত্তরণের পথ: যৌক্তিক পদসোপান ও মেধাভিত্তিক কাঠামো
আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের এই ঐতিহাসিক ব্যাধি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারি কাঠামোতে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। ১. যৌক্তিক পদসোপান তৈরি: প্রতিটি ক্যাডারের মোট জনবলের অনুপাত ও ভলিউম বিবেচনা করে একটি সুনির্দিষ্ট, যৌক্তিক ও বৈষম্যহীন পদসোপান তৈরি করতে হবে। প্রতিটি ক্যাডারেই সমান অনুপাতে গ্রেড-১, গ্রেড-২ এবং গ্রেড-৩ পদ সৃষ্টি করতে হবে, যেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা তাদের যোগ্য মর্যাদা পান। ২. ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের আধুনিকায়ন: রাষ্ট্রীয় মর্যাদাক্রম বা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে কেবল নির্দিষ্ট প্রশাসনিক পদকে প্রাধান্য না দিয়ে অন্যান্য ক্যাডারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও পদবী ও যোগ্যতা অনুযায়ী অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ৩. কোটামুক্ত উপসচিবায়ন: উপসচিব বা তদূর্ধ্ব পদে পদোন্নতির জন্য বিদ্যমান কোটা বাতিল করে কেন্দ্রীয় মেধাভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে সব ক্যাডার থেকে সেরা মেধাগুলোকে নির্বাচন করতে হবে।
ঙ. এখনই উপযুক্ত সময়
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে বহু বছর পর আজ সরাসরি জনগণের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে একটি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। এই সরকারের কোনো রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা বা কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর তোষণ করার প্রয়োজন নেই। ফলে বহুল কাঙ্ক্ষিত ও বিলম্বিত আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়নের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এখনই।
জনগণের আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বর্তমান সরকারের রয়েছে প্রয়োজনীয় সব রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা। সরকার যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই ক্ষোভ ও বৈষম্যের নিরসন সম্ভব। একটি বৈষম্যমুক্ত, মেধাভিত্তিক, জনবান্ধব, দেশপ্রেমিক, উন্নত ও আধুনিক সিভিল সার্ভিস গঠিত হলে তবেই দেশের শাসনব্যবস্থায় কাক্সিক্ষত গতিশীলতা আসবে এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা)
শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক ।









