সংবাদপত্রের নীতি ও দায়বদ্ধতা: ‘দৈনিক কুমিল্লার জমিন’-এর নিবন্ধ ঘিরে কিছু প্রশ্ন
গণমাধ্যমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব সমাজের অসংগতি তুলে ধরা এবং পেশাগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে যখন সংবাদপত্রের নিজস্ব পাতাতেই পেশাগত নীতিমালা এবং আইনি সচেতনতার বিচ্যুতি চোখে পড়ে, তখন তা সংশ্লিষ্ট পেশা ও পাঠকদের ভাবিয়ে তোলে।
সম্প্রতি ‘দৈনিক কুমিল্লার জমিন’ পত্রিকার ৬ নম্বর পৃষ্ঠায় প্রকাশিত কলামিস্ট হানিফ খানের লেখা “একশ টাকার আইডি কার্ড যখন হাজার টাকায় বিক্রি হয়” নিবন্ধটি পর্যালোচনা করলে নিবন্ধটির উপস্থাপনা, বার্তা কক্ষের সম্পাদনা ফিল্টার এবং আইনি সচেতনতা নিয়ে বেশ কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।
মোবাইল জার্নালিজম ও বর্তমান বাস্তবতা নিবন্ধটিতে নতুন প্রজন্মের তরুণ সাংবাদিকদের ঢালাওভাবে “মোবাইল সাংবাদিক” বা “ক্ষুধার্ত” আখ্যা দিয়ে যে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে, তা আধুনিক বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ‘মোবাইল জার্নালিজম’ (MoJo)-এর ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরা বর্তমান সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতার ঘাটতি ব্যক্তি বিশেষের হতে পারে, কিন্তু ঢালাওভাবে পুরো প্রযুক্তিভিত্তিক চর্চাকে বা নতুনদের আক্রমণ করা গঠনমূলক সাংবাদিকতার পরিপন্থী।
আইনি দায়ভার এবং ‘ডিসক্লেইমার’ বিতর্ক পত্রিকাটিতে মতামতের উপরে উল্লেখ করা হয়েছে— “এই বিভাগের কোন মতামতের জন্য কুমিল্লার জমিন দায়ী নয়।” তবে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের আইনি কাঠামো অনুযায়ী এই ধরনের ছাড়পত্র পুরোপুরি কার্যকর নয়। The Printing Presses and Publications (Declaration and Registration) Act এবং বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল-এর সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী, পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত প্রতিটি তথ্য, শিরোনাম বা নিবন্ধের প্রাথমিক ও চূড়ান্ত নৈতিক এবং আইনি দায়ভার সম্পাদক ও প্রকাশকের ওপরই বর্তায়।
সুনির্দিষ্ট তথ্য ব্যতিরেকে অভিযোগ ও আইনি ঝুঁকি নিবন্ধটির শিরোনামে “একশ টাকার আইডি কার্ড হাজার টাকায় বিক্রি” কথাটি উল্লেখ করে একটি গুরুতর দুর্নীতির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুরো লেখার কোথাও কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ, অনুসন্ধানী তথ্য বা অভিযুক্ত পক্ষের উল্লেখ নেই। প্রমাণ ছাড়া সংবাদপত্রের পাতায় এ ধরনের ঢালাও অভিযোগ আনা বাংলাদেশের দণ্ডবিধি (Penal Code)-এর ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা (মানহানি) এবং প্রেস কাউন্সিলের আচরণবিধির দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ।
সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেস কার্ডের পেশাগত মর্যাদা স্থানীয় প্রেস ক্লাব এবং সাংবাদিকদের পেশাদার সংগঠনগুলো গণমাধ্যমের স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করে। কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই স্থানীয় প্রেস ক্লাব বা সহকর্মীদের লক্ষ্য করে সংবাদপত্রের পাতায় ঢালাও মন্তব্য করা পেশাগত সম্প্রীতি বিনষ্ট করে। তদুপরি, একটি প্রেস কার্ডের শারীরিক উৎপাদন বা প্রিন্টিং খরচ ৫০ বা ১০০ টাকা হতে পারে, কিন্তু তার মূল ভিত্তি হলো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও সংবাদকর্মীর পেশাগত মূল্য। এই পেশাগত পরিচয়পত্রকে কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্যের সাথে তুলনা করা সাংবাদিকতার মৌলিক ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শিরোনাম ও বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্যতা নিবন্ধটির শিরোনাম যেখানে আইডি কার্ড বিক্রির সিন্ডিকেট কেন্দ্রিক, সেখানে লেখার বড় একটি অংশে প্রাবন্ধিকের নিজের অতীত জীবনের স্মৃতিচারণ স্থান পেয়েছে। শিরোনামের সাথে ভেতরের মূল লেখার এমন অসংগতি পেশাদার সাংবাদিকতায় পাঠকদের বিভ্রান্ত করার শামিল।
উপসংহার নিবন্ধটির শেষ লাইনে উল্লেখ করা হয়েছে, “পরিবারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে ন্যায়নীতি সততা কর্মনিষ্ঠা অপরিহার্য।” এই বার্তাটি যেকোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্যই শিক্ষণীয়। অন্যকে নীতি শেখানো বা পেশাদারি নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের উচিত নিজেদের সম্পাদনা বিভাগকে আরও শক্তিশালী করা, আইনি দায়বদ্ধতা মেনে চলা এবং পেশাগত বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা। নিজের ভেতরের আইনি সচেতনতা ও সম্পাদনার গুণগত মান নিশ্চিত করাই একটি দায়িত্বশীল সংবাদপত্রের প্রাথমিক শর্ত।
মোঃ সাকিব হোসেইন, তিতাস উপজেলা, (কুমিল্লা) সংবাদদাতা।









