বাংলাদেশে কোনো এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে নতুন করে আবেগ, প্রশংসা কিংবা রাজনৈতিক প্রচার দেখা দিলে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়। বরং ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকেই প্রশ্নটি করা প্রয়োজন—কেন এখন? কোন ইতিহাসকে সামনে রেখে এই আবেগ তৈরি হচ্ছে? আর কোন ইতিহাসটি একই সঙ্গে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে?
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিঃসন্দেহে উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের গুরুত্ব স্বীকার করা এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে একমাত্রিকভাবে মহিমান্বিত করা এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজকের বাংলাদেশ একসময় পাকিস্তানের অংশ ছিল। সেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রকাঠামো, ভাষানীতি, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শেষ পর্যন্ত বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাস—সবকিছু মিলিয়েই বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস তৈরি হয়েছে।
জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অধ্যায় ছিল মুসলিম রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। ব্রিটিশ ভারতের সাংবিধানিক রাজনীতিতে তিনি মুসলিম লীগের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং শেষ পর্যন্ত পৃথক রাষ্ট্রের দাবির প্রধান রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব থেকে ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বের ইতিহাস উপমহাদেশের রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়।কিন্তু এখানেই ইতিহাস শেষ নয়।পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববাংলার জনগণের সামনে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা, ভাষা, প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক অধিকার নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়, সেগুলোও ইতিহাসের অংশ। ফলে জিন্নাহকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে শুধু পাকিস্তান সৃষ্টির কৃতিত্বের কথা বললে চলবে না; পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরে পূর্ববাংলার সঙ্গে কেন্দ্রের সম্পর্ক কীভাবে বিকশিত হয়েছিল, সেটিও আলোচনায় আনতে হবে।
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন একটি কেন্দ্রীয় ঘটনা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর একক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ পূর্ববাংলায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
১৯৪৮ সালে ঢাকায় জিন্নাহর বক্তব্যে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান স্পষ্টভাবে উঠে আসে। তাঁর বক্তব্যের বিরুদ্ধে তখনই বাংলাভাষী শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে প্রতিবাদ দেখা দেয়।
পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে পরিণত হয়।
তাই আজ জিন্নাহর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা হলে ১৯৪৮ সালের ভাষা-সংক্রান্ত অবস্থানও আলোচনায় থাকা উচিত। কেবল তাঁর রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার ভূমিকা তুলে ধরে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বাদ দিলে সেটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হবে না।
কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে একটি পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে ইতিহাস সহজ হয়ে যায়, কিন্তু সত্যকে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
জিন্নাহ ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান নেতা। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতা, যে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে পরবর্তী সময়ে পূর্ববাংলার মানুষের সঙ্গে কেন্দ্রের গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।এই দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতায় আসে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।
অর্থাৎ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ইতিহাসকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানেই বর্তমান প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আজ যদি জিন্নাহকে নিয়ে নতুন করে অতিরিক্ত আবেগ, প্রশংসা কিংবা রাজনৈতিক প্রচার তৈরি হয়, তাহলে প্রশ্ন করা যেতে পারে—এই স্মরণ কি কেবল ইতিহাসকে জানার চেষ্টা, নাকি বর্তমানের কোনো রাজনৈতিক বয়ানকে শক্তিশালী করার চেষ্টা?
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Post Views: 44
Related