একটি জাতির মেরুদণ্ড গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষের নিভৃত কোণে, শিক্ষকের স্নেহার্দ্র নির্দেশনায় এবং জ্ঞানের আলো ছড়ানোর অবিরাম প্রচেষ্টায়। কিন্তু আজ সেই শ্রেণিকক্ষগুলো যেন এক অতল নীরবতায় ডুবে যাচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষের মনে আজ একটিই প্রশ্ন জাগছে—যে শিক্ষকদের হাতে থাকার কথা ছিল চক বা মার্কার, ডাস্টার আর কলম; তারা যখন ব্যানার, ফেস্টুন আর প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথের উত্তপ্ত পিচে এসে দাঁড়ান, তখন ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াবে কে?
এই দৃশ্যটি কেবল করুণ নয়, অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। শিক্ষা ক্যাডারের এই আহাজারি কোনো বিলাসী জীবনের দাবি নয়, এটি বঞ্চনার শেষ সীমায় পৌঁছে যাওয়া একদল জ্ঞানসাধকের বাঁচা-মরার আকুতি। প্রজাতন্ত্রের অন্য দশটি ক্যাডারের মতো তারাও মেধার স্বাক্ষর রেখে এই সার্ভিসে এসেছেন। অথচ আজ তারা নিজেদের প্রাপ্য মর্যাদা ও অধিকারের জন্য ধুলোবালি মাখা রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছেন। কোনো জাতির জন্য এর চেয়ে বড় দুঃখের আর কিছু হতে পারে কি?
বৈষম্যের দীর্ঘ ছায়া ও বঞ্চনার ইতিহাস: দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার হলেন এই বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারগণ। একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রতি এক ধরনের অদৃশ্য শীতল আচরণ করে আসছে। ৩৫, ৩৬, ৩৭ এবং ৩৮ ব্যাচ পদোন্নতির সকল যোগ্যতা অর্জন করেছে, পদোন্নতি হয়নি। কয়েকবার পদোন্নতির জন্য ডিপিসি বসার খবর শুনা গেলেও পদোন্নতির কোন সুসংবাদ আসেনি। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের কোন ক্যাডারেই এতোগুলো ব্যাচ একই সাথে পদোন্নতির সকল যোগ্যতা অর্জন করার পরও দীর্ঘদিন পদোন্নতিবিহীন থাকা খুবই নজিরবিহীন। বিসিএস সিভিল এডুকেশনের জন্য এটা খুবই হতাশার বিষয়।
শিক্ষা ক্যাডারগণ কিন্তু প্রজাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ: ক্যাডারগুলোর চেয়ে অতিরিক্ত কোনো রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা দাবি করেননি।তারা চেয়েছেন কেবল সমতা।চেয়েছেন তাদের ন্যূনতম পেশাগত অধিকারটুকু। বিসিএস প্রশাসনসহ অন্য ক্যাডারগুলোতে ৩৮ ব্যাচসহ পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনকারী সবার পদোন্নতি হলেও শিক্ষা ক্যাডারের ৩৫-৩৮ এর সকল ব্যাচকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
এক দশক সময় একই পরিচয় বহনঃ
৩৫তম বিসিএস যোগদান করে ২০১৭ সালের মে মাসের ২ তারিখ । তাদের চাকুরিকাল প্রায় এক দশক বা ১০ বছর পূর্ণ হলেও পদোন্নতিহীনভাবে সেই প্রভাষক পরিচয় বহন করছে একটি অংশ। এ ব্যাচের আংশিক পদোন্নতি হয়েছে।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে যোগদান করে ৩৬ তম বিসিএস। চাকরিকাল ৯ম বছরে পদার্পন করলেও একই পদে চাকুরি করে পদোন্নতি বঞ্চিত রয়েছে এ ব্যাচের কর্মকর্তাগণ।
২০১৯ সালের এপ্রিলে যোগদান করার পর ৩৭ তম বিসিএস প্রায় ৮ বছর চাকুরি করছে শিক্ষা ক্যাডারে , কোন পদোন্নতি হয়নি।
৩৮তম বিসিএস ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে যোগদান করে প্রায় ৬ বছর পূর্ণ করেও পদোন্নতি বঞ্চিত রয়েছে।
৩৬ থেকে ৪৯তম বিসিএসের সবাই প্রভাষকঃ
৩৬ তম বিসিএসের সবাই প্রভাষক। ইতোমধ্যে ৪৯তম বিসিএস যোগদান করায় দীর্ঘ ১৩ ব্যাচের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও ৩৬তম থেকে শুরু করে ৪৯তম পর্যন্ত সকল বিসিএসের সবাই প্রভাষক। ফলে আত্নপরিচয় নিয়ে এবং সিনিয়রিটি নিয়ে ব্যাপক হতাশা তৈরি হয়েছে শিক্ষা ক্যাডারে। একমাত্র দ্রুত পদোন্নতিই পারে এমন হতাশাজনক অচলাবস্থা দূর করতে।
অন্যান্য ক্যাডারে যেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর পদোন্নতির স্বাভাবিক গতি বজায় থাকে, সেখানে শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতি যেন এক সোনার হরিণ। সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপক পদের যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর একই পদে থমকে থাকতে হয় তাদের। চাকরির বয়স শেষ হয়ে যায়, মেধার অবমূল্যায়ন ঘটে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতির পদ সৃষ্টি হয় না। এই যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হতাশা ও বঞ্চনা—তা কেবল একজন শিক্ষকের মানসিক মনোবলকেই ভেঙে দেয় না, বরং গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে তোলে।
‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ ও শিক্ষা খাতের গুরুত্ব:
আমরা আজ এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। এক বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক এবং প্রগতিশীল সমাজ গড়ার নতুন প্রত্যয় চারদিকে। কিন্তু এই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিপ্রায় কি শিক্ষাকে অবহেলা করে কখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব?
বর্তমান সরকারের নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে সৎ ইচ্ছা ও অঙ্গীকার, তার মূল ভিত্তি হতে হবে শিক্ষা। মেধা ও যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন ছাড়া কোনো জাতি এগোতে পারে না। শিক্ষকেরা যদি তাদের সামান্য চাওয়া-পাওয়ার জন্য, একটু পদোন্নতির জন্য কিংবা সঠিক মূল্যায়নের জন্য রাজপথে রাজপথে ঘুরে বেড়ান, তবে এই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রথম শর্তই হওয়া উচিত শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া এবং শিক্ষকদের মুখে হাসি ফোটানো।
সমস্যা সমাধানের পথ: রাষ্ট্রের সদয় বিবেচনা ও দুটি মৌলিক দাবি:শিক্ষা খাতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা খুব বেশি কঠিন কিছু নয়। সরকারের একটু সহানুভূতি, একটু সদয় বিবেচনা এবং ইতিবাচক সদিচ্ছাই পারে এই বিষণ্ন মেঘ কেটে আলোর মুখ দেখাতে। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের সংকট নিরসনে মূলত দুটি স্থায়ী পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি:
ক) ক্যাডার গ্রেড আপগ্রেড ও নিয়মিত পদোন্নতি নিশ্চিতকরণঃ
শিক্ষা ক্যাডারের পদসোপান পুনর্বিন্যাস করা অত্যন্ত জরুরি। শূন্য পদের সাপেক্ষে নয়, বরং জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যান্য সার্ভিসের মতো শিক্ষা ক্যাডারেও গ্রেড আপগ্রেডেশন এবং সুপারনিউমারারি পদোন্নতি নিশ্চিত করে দীর্ঘদিনের পদোন্নতিজট একবারে নিরসন করা সম্ভব।
খ) ডিজিটাল মাধ্যমে স্থায়ী ও স্বচ্ছ বদলি নীতিমালাঃ
শিক্ষকদের একটি বড় ভোগান্তি হলো বদলি প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক তদবির, হয়রানি আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ও অ্যালগরিদমভিত্তিক বদলি নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। একজন শিক্ষক যাতে ঘরে বসেই অনলাইনে নিজের যোগ্যতা ও শূন্য পদের ভিত্তিতে স্বচ্ছ উপায়ে বদলির আবেদন ও পদায়ন পেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
ক্লাসে ফিরে আসুক আলোর প্রদীপ:আমরা আর কোনো শিক্ষককে রাজপথে ব্যানার হাতে দেখতে চাই না। আমরা দেখতে চাই না কোনো বিষাদগ্রস্ত শিক্ষককে, যিনি বঞ্চনার ক্ষোভ বুকে চেপে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করছেন। কারণ একজন অসন্তুষ্ট ও অবমূল্যায়িত শিক্ষকের কাছ থেকে কখনো উন্নত পাঠদান আশা করা যায় না।
রাষ্ট্রের কাছে আকুল আবেদন—আমাদের এই দুঃখিনী শিক্ষা ক্যাডারের প্রতি অবিলম্বে সদয় দৃষ্টি দিন। তাদের ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নিয়ে শিক্ষা খাতে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ফিরিয়ে আনুন। শিক্ষকেরা যেন রাজপথ ছেড়ে দ্রুত তাদের আপন ভুবন—সেই প্রিয় শ্রেণিকক্ষে ফিরে যেতে পারেন। শিক্ষক হাসলে শিক্ষা হাসবে, আর শিক্ষা হাসলেই কেবল গড়ে উঠবে কাঙ্ক্ষিত, সমৃদ্ধ ‘নতুন বাংলাদেশ’।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা,
শিক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক।









