সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। সব ধরনের প্রাণি থেকে মানুষ আলাদা বা অন্যরকম। অন্যান্য সৃষ্টি বা প্রাণীর থেকে মানুষ উন্নত হওয়ার কারণ হচ্ছে তা বুদ্ধিবৃত্তি। মানুষ এই বুদ্ধিবৃত্তির দৌলতে বুঝতে এবং অনুভব করতে পারে ভালো-মন্দ, ভুল-সঠিক, দোষ-গুণ ইত্যাদি। আর এই বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যেই মানুষ ধীরে ধীরে সভ্য হতে হতে সভ্য সমাজ গড়ে তুলে নিজেদের আলাদা করে নিয়েছে অন্য প্রাণিদের থেকে। কিন্তু যে মানসিক বোধ আমাদের অসভ্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে, সেই বৈষম্য বোধ ধীরে ধীরে নিজেদের মধ্যে ঠাঁই নিয়েছে বহুকাল যাবৎ।
বিভিন্নভাবে বিভিন্ন রকম অসমতা বা বৈষম্যবোধ আমাদের মধ্যে বিরাজ করছে। তার মধ্যে নারী ও পুরুষের বৈষম্য বা প্রভেদ আমাদের সমাজের একটা বিশাল জায়গা জুড়ে অবস্থান করছে। এই বৈষম্য এতটাই প্রকট, যা সমাজের উন্নয়ন পথে একটা বিরাট বাধার সৃষ্টি করে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। এই বিভেদ দূর করতে না পারলে আমাদের সমাজের সর্বস্তরের সমান্তরাল উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়নকে যদি আমরা রেলগাড়ি হিসেবে বিবেচনা করি, তবে তার চলার জন্য রেললাইনটাকে সমান্তরালভাবেই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
নয়তো কী বিরাট বিপদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, তা সহজেই অনুমেয়। আর এই উন্নয়নের রেলগাড়িকে স্বাগত জানাতে হলে আমাদের মজবুত ভিতের উপর তার ট্র্যাক স্থাপন করতে হবে। সেই ভিত গড়তে সাহায্য করবে আমাদের শিক্ষা। সর্বস্তরের নারী-পুরুষকে শিক্ষা দিয়ে সচেতন ও শিক্ষিত করে তুলতে পারলেই বিভেদ-বৈষম্য দূর করে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে, দূর হবে বৈষম্যমূলক মানসিকতা।
বহুকাল ধরে মেয়েদের শিক্ষিত, সচেতন ও দক্ষ করে তোলার প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ ও ভাবনা ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। কোনো পরিবারে যদি সমবয়সী একটি কন্যাসন্তান ও একটি পুত্রসন্তান থাকে, স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায় যে, সেই পুত্র সন্তানের প্রতি সবারই মনোযোগ একটু বেশি থাকে। পুত্রসন্তানকে বড়ো ও মানুষ করার জন্য পরিবারের প্রত্যেকটি লোকের সহযোগিতা ও আন্তরিকতার কোনো অভাব থাকে না। সে ক্ষেত্রে মেয়েটি বঞ্চিতই থেকে যায়।
সবার ধারণা ছেলে বড়ো হয়ে আয়-রোজগার করবে, সংসারের হাল ধরবে। আর মেয়ে বড়ো হলে তাকে বিয়ে দিতে হবে চলে যাবে অন্যের ঘরে। তাতে অনেক টাকা-পয়সা খরচ হবে এবং বিয়ে দেওয়ার পরও সে বাড়ির বা ঘরের কাজই করবে। তাই তার পেছনে এখন অযথা টাকা ও সময় নষ্ট না করে ঘরের কাজগুলোই তাকে দিয়ে বেশি করে করানো বা শেখানো হয়। এতে মায়ের এবং বাড়ির বয়স্ক মহিলাদেরও একটু সাহায্য হয়। সেই সঙ্গে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালোলাগা-মন্দলাগা, চাহিদা, আনন্দ ইত্যাদি সব অনুভূতিকে অবদমিত করতে করতে অনুশীলন করানো হয়। যার প্রতিফলন ঘটে তার পরবর্তী জীবনে। যদিও ভাগ্য ভালো ঘর-বর পেয়ে যায়, তবে তার জীবন কাটে সুখ-দুঃখের সংমিশ্রণে।
আর যদি কারো ভাগ্যে না জোটে ভালো কিছু, সে নিজের অনুভূতিগুলো অবদমন করতে করতে হতে থাকে নিপীড়িত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত এবং মানসিক অবসাদগ্রস্ত। অতঃপর এক সময় বেছে নেয় আত্মহত্যার মতো নিষিদ্ধ পথ। বলা যায়, এই বিভেদ বা বৈষম্য আমাদের সমাজে একটা মানসিক প্রবণতা, যা দীঘকাল যাবৎ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এবং বিশাল এক জনগোষ্ঠীর মনে তা অলিখিত নিয়মের মতো গেঁথে সচেতন হতে হবে। আর তা সম্ভব শুধু শিক্ষার সাহায্যে। সবাই সচেতন হলে, জেগে উঠলেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে যে-কোনো পুরুষ যদি হন সংসারের কর্ণধার, তবে মহিলাকেও ধরতে হবে হাল শক্ত ও দক্ষ হাতে। সে জন্যই প্রয়োজন তার শিক্ষা ও দক্ষতার।
বস্তুত নারী গৃহকর্মে নিজেকে নিয়োজিত রাখুক অথবা বহির্জগতে সর্বক্ষেত্রেই তার জীবনে শিক্ষা আবশ্যক। এছাড়া আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সূতিগৃহ আমাদের পরিবার। সেখান থেকেই তার শিক্ষা শুরু। যেহেতু বাড়ির অভ্যন্তরীণ দায়িত্বে মা অথবা মাতৃস্থানীয়রা থাকেন, তাই শিশু বেশি সময় তাদের সংস্পর্শে থাকে এবং তাদের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে থাকে, যা পরবর্তী জীবনে তার চলার পথের পাথেয় হয়ে থাকে। নেপোলিয়ান বলেছিলেন, ‘আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত জাতি দেব’। মা শিক্ষিত হলেই তিনি শিশুকে সঠিক শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলতে পারবেন।
একজন শিক্ষিত মায়ের শিক্ষিত সন্তানই পারে শিক্ষিত সমাজ গড়ে তুলতে। আর শিক্ষিত সমাজই দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তাই প্রত্যেক নারী-পুরুষ সবার প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মানুষ হিসেবে প্রত্যেককে শিক্ষিত ও সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, কোনো বাড়ির বাইরের দিকটাই শুধু প্লাস্টার ও রং দিয়ে চকচকে করে সাজিয়ে রাখলেই চলবে না, তার ভেতরের দিকটাও সংস্কার সাধন প্রয়োজন, নয়তো এর পরিণাম সবার জানা। তাই শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের মানসিকতা, চিন্তা, চেতনাকে উন্নত করতে হবে এবং সুপ্ত চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে। প্রত্যেক মানুষই কিছু না কিছু সুপ্ত চেতনা ও প্রতিভা নিয়ে জন্মেছে। সেই প্রতিভার সুসংগত বিকাশ ঘটিয়ে সমাজের উন্নয়নের গতি তরঙ্গকে সুসংহত করার প্রধান হাতিয়ার শিক্ষা।
দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। বৈষম্যের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই নারী সমাজকে যদি অশিক্ষা ও কুসংস্কারের আবর্তে আবদ্ধ করে রাখা হয়, তরে সমাজের একটি অংশ অচল বা পঙ্গু হয়ে থাকবে। যা কিছু অচল, তা অন্যের বোঝাস্বরূপ যা কারোরই কাম্য নয়। যারা এই বৈষম্যের বেড়াজাল ভেঙে নিজেদের শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন, সেসব অনন্যা নারীর কৃতিত্ব সবার সামনে দৃষ্টান্তস্বরূপ তুলে ধরতে হবে।
আমাদের নারী সমাজের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া, তাঁর সময়েই তিনি অনুভব করেছিলেন শিক্ষা নারীর জীবনে কতখানি জরুরি। তাই তিনি নারী শিক্ষার জন্য বহু বাধা-বিঘ্ন উপেক্ষা করে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের স্কুল স্থাপন করেছিলেন। বেগম ফয়জুন্নেসা ও বেগম সুফিয়া কামালের মতো আরও অনেক কৃতী ও মহীয়সী নারী রয়েছেন, যারা নারী-পুরুষের বৈষম্যের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ হিসেবে , সমাজের একজন হিসেবে, দেশের নাগরিক হিসেবে দেশের জন্য, জাতির জন্য কল্যাণ সাধন করে গেছেন।
বর্তমানে অবশ্য অনেকাংশে নারীদের ঘরে ও বাইরে সমানভাবে সঞ্চালন রয়েছে। নারীরা নিজেদের শিক্ষিত ও সচেতন করে তুলতে নানাভাবে আত্মপ্রয়াস চালাচ্ছে। কারণ বিশ্বায়নের যুগে প্রচার মাধ্যমের সহায়তায় নারী এখন বহু কীর্তি সম্পর্কে সচেতন। নারীর সামনে কাজের পরিসর এখন বিস্তৃত। সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা নারীদের শিক্ষিত, দক্ষ ও সচেতন করে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তবে তা শুধু নারী নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্যই প্রয়োজন।
ঘরের মেয়ে বা নারীকে শিক্ষিত করে তুলতে হলে, তার পাশের মানুষটির মধ্য থেকে আগে বৈষম্য দূর করে তার মধ্যে নারী-শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি জাগাতে হবে। কারণ অবদমিত নারী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো ক্ষমতা থাকে না। সে নির্ভর করে থাকে কারও উপর। তা ছাড়া আমাদের দেশে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বর্তায় পুরুষের উপর, এখানে সাধারণত নারীর কোনো ভূমিকাই স্বীকার করা হয় না।
বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যদি পুরুষ ও মহিলা উভয়ে কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সার, কীটনাশক ইত্যাদি সমপরিমাণে পায়, তাদের উৎপাদনশীলতাও সমান হবে। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, নারী ও পুরুষের বৈষম্য দূর করতে আমরা যদি পাশাপাশি মানুষ হিসেবে পথ চলতে অনুসরণ ও অনুশীলন করি, তবেই আমাদের পক্ষে একটা সুন্দর ও সুদূঢ় ভবিষ্যতের স্বপ্ন সফল ও সার্থক হবে।
Post Views: 376
Related