(জাপানের অধ্যাপক তাকাহারা আকিওর বক্তৃতা)
‘অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের পথে: বঙ্গোপসাগর ঘিরে এর ভিশন, তাৎপর্য এবং বাস্তবিক দিকসমূহ" শিরোনামে
জাপানের অধ্যাপক তাকাহারা আকিওর এক অনলাইন বক্তৃতা গত ২৭ অক্টোবর, ২০২২ অনুষ্ঠিত হয়েছে। জনাব তাকাহারা
আকিও হলেন টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও রাজনীতি অনুষদের একজন অধ্যাপক। বেসরকারি নর্থ সাউথ
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (এসআইপিজি) এবং বাংলাদেশে জাপানের
দূতাবাস যৌথভাবে এই বক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অধ্যাপক তাকাহারার বক্তৃতায় উঠে আসে বর্তমান বিশ্বের ক্রমবর্ধমান বিভক্তি আর সংঘাত এড়াতে জাপান কিভাবে
ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি তুলে ধরেন যে মানব-নিরাপত্তা এবং অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল (এফওআইপি)
উৎসাহিত করতে জাপান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
তিনি জানান, এফওআইপির লক্ষ্য হলো পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এমনকি আফ্রিকা
পর্যন্ত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্র প্রসারিত করা। এ সময় তিনি এফওআইপির প্রধান তিনটি স্তম্ভের
বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এগুলো হলো: এক. শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি; দুই. আইনের শাসনের
প্রচার ও প্রতিষ্ঠা, সামুদ্রিক চলাচলের স্বাধীনতা ও মুক্ত বাণিজ্য এবং তিন. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের প্রচেষ্টা।
এসব বলার পর, অধ্যাপক তাকাহারা এফওআইপি বাস্তবায়নে জাইকা পরিচালিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নীতিসহ
বেশ কয়েকটি পারষ্পারিক সহযোগিতামূলক প্রকল্পের বিষয় সবার সামনে তুলে ধরেন। তিনি এমন মন্তব্যও করেন যে,
চীনের ‘বিল্ড অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই)’ পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এফওআইপি করা হয়নি, বরং অর্থনৈতিক
ক্ষেত্রে এ দুটোই একসঙ্গে চলতে পারে।
চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে অধ্যাপক তাকাহারা বলেন যে এক্ষেত্রে মূলত দুটো বিষয় রয়েছে; এগুলো হলো:
ভঙ্গুরতা এবং সহনশীলতা। এবং এসব ক্ষেত্রে জাপানও দ্বিমুখী প্রক্রিয়ায় চীনকে মোকাবিলা করতে পারে; আর সেগুলো
হলো: প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা। সবশেষে আইনভিত্তিক ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক ও এর আশেপাশের
অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি বাড়াতে এফওআইপি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তিনি পুনর্ব্যক্ত
করেন।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি। তিনি বলেন, সারা
বিশ্ব নিত্য-নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়ায় আইনের শাসনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ
হয়ে ওঠেছে। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘ সনদের মূলনীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ইউক্রেনের অখণ্ডতার বিষয়ে সাধারণ পরিষদের
আনা প্রস্তাবটিতে পক্ষে ভোট দেওয়ায় তিনি বাংলাদেশের প্রশংসা করেন।
রাষ্ট্রদূত ইতো জাপানের সদ্যপ্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এবং বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার
যৌথ উদ্যোগে ২০১৪ সালে চালু হওয়া ‘বিগ-বি’ ইনিশিয়েটিভের আওতায় জাইকার নেওয়া অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর সার্বিক
অগ্রগতির প্রশংসা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ‘কম্প্রিহেনসিভ
পার্টনারশীপ’ থেকে ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশীপ’-এ উন্নীত হবে, যেন বাংলাদেশ ও জাপান প্রতিরক্ষা খাতসহ নতুন নতুন
ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা শুরু করতে পারে।
এই ওয়েবিনারের একজন আলোচক ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সোশিওলজি বিভাগের
সহযোগী অধ্যাপক ড. জসীম উদ্দিন। তিনি তাঁর আলোচনায়
গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদের মধ্যে আদর্শিক সংঘর্ষ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ টেনে
তিনি বলেন, জনগণের ক্রমবর্ধমান দুর্ভোগ এবং ২০২৩ সালে বিশ্ব যে সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারে, তার জন্য
কাকে দায়ী করা উচিত।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. উদ্দিন যুক্তি দেন যে বাংলাদেশের আসলে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে যাওয়া ঠিক হবে না। বরং "সবার
সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়"— দীর্ঘ দিনের এই পররাষ্ট্রবিষয়ক মূলনীতির ভিত্তিতেই তাদের এগিয়ে যাওয়া
উচিত। তিনি মনে করেন, জাপানের এফওআইপি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আইপিইএফে যোগদান
বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত এসব ব্লকে যোগদান বাংলাদেশের জন্য দৃশ্যমান সুযোগ-সুবিধা বয়ে
আনবে। তিনি জাপান এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং বিশ্বশান্তি প্রচারে আরো
সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন। ড. উদ্দিন যুক্তি দিয়ে দেখান যে, জাপান-বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যসহ সহযোগিতার এখনো প্রচুর সুযোগ রয়েছে। সবশেষে মানবাধিকার, আইনের
শাসন এবং বিশ্বশান্তি প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়ার পথ হিসেবে মানব-নিরাপত্তার বিষয়টিকে সামনে এনে অধ্যাপক
তাকাহারা যে প্রচারনা চালাচ্ছেন তার প্রশংসা করেন ড. উদ্দিন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম ওয়েবিনারের সভাপতিত্ব করেন। তিনি শক্তিধর
রাষ্ট্রগুলো সম্প্রতি বঙ্গোপসাগর নিয়ে যে আগ্রহ দেখাচ্ছে সে বিষয়ে আলোকপাত করেন এবং বাংলাদেশ এক্ষেত্রে
সফলভাবে তার কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের (এসআইপিজি) পরিচালক এবং পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড
সোশিওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তৌফিক এম. হক ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের
অর্থনৈতিক উন্নয়নে বঙ্গোপসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সংযোগের আঞ্চলিক কেন্দ্র
হিসেবে বঙ্গোপসাগর এবং বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত গুরুত্বও তুলে ধরেন।
ওয়েবিনারে শিক্ষাবিদ, গুণীজন, সমুদ্র-অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, জাপানি প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং শিক্ষার্থীরা
উপস্থিত ছিলেন।








