বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে ৫৫০ জনকে পুলিশ সুপার করার নিতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে একই পদে আটকে থাকা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়া হলেও আগের কর্মস্থলেই থাকবেন। পদোন্নতি দেয়ার তালিকায় রয়েছে ২৮, ২৯, ৩০ ও ৩১তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তারা। ২৭ বাচের কিছু কর্মকর্তাও রয়েছেন ওই তালিকায়। মূলত দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি না পাওয়ার হতাশা থেকে বের করে আনতেই এ ধরনের কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে। এটিকে ‘নির্বাচনি’ পদোন্নতি আখ্যা দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, নির্বাচনের আগে কিছু জেলার পুলিশ সুপার ও অন্তত দুটি বিভাগের ডিআইজি পদে রদবদল আসতে পারে। এর মধ্যে অন্তত ১৭ জেলার এসপির নামের সঙ্গে ভিন্নমতালম্বী দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি মিডিয়া মো. মনজুর রহমান বলেন, মসৃণ পদ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পদ তৈরির জন্য তারা কাজ করছে।
বিষয়টি বিচেনাধীন অবস্থায় রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, পদ না থাকায় পদোন্নতি পাচ্ছেন না ৫৫০ জন কর্মকর্তা। এ কারণে, ইন-সিটু পদোন্নতির প্রস্তাব ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের পুলিশ ম্যানেজমেন্ট-১ শাখার মাধ্যমে শিগগিরই এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হবে। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, শূন্য পদের অভাবে অনেককেই পদোন্নতি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্যাডার কর্মকর্তাদের হতাশা দূর করার জন্য এ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনি বছরে অতিরিক্ত কাজের চাপ নিতে তারা অসন্তুষ্ট। যদিও এ ধরনের পদোন্নতি, যা ইনসিটু নামে পরিচিত, আমলাতন্ত্রে অস্বাভাবিক।
সূত্রমতে, একজন পুলিশ ক্যাডার সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসাবে চাকরিতে যোগদান করেন। ১০ বছর চাকরির পর এসপি পদে পদোন্নতি হওয়ার কথা। এ কর্মকর্তারা ২৮, ২৯, ৩০ ও ৩১তম বিসিএস ব্যাচের। ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ২০১০ সালে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ পান এবং পরবর্তী তিন ব্যাচের কর্মকর্তারা পরবর্তী বছরগুলোতে চাকরিতে যোগদান করেন। বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যে এসপি পদটি পঞ্চম। অবিলম্বে পদ সৃষ্টির উদ্যোগ না নিলে ক্যাডারের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা অতিরিক্ত এসপি হিসেবে অবসর নেবেন বলে তাদের ধারণা।
পিএইচকিউ ডাটাবেজ অনুযায়ী, ২৮তম বিসিএস ক্যাডার ব্যাচের ১৫০ জন কর্মকর্তা অতিরিক্ত এসপি থেকে এসপি পদে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। ২৯তম বিসিএস ক্যাডার ব্যাচের ৩৫ জন কর্মকর্তা, যারা ২০১১ সালে বাহিনীতে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু ২০৩০ সালের মধ্যে মাত্র ৭৭টি এসপি পদ খালি থাকবে। কারণ এসপি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সেই সময়ের মধ্যে অবসর পূর্ব ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা রয়েছে। এ সাত বছরে ২৩৩ জন কর্মকর্তা, ৮১ জন অতিরিক্ত ডেপুটি সহ ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি), ৫৭ ডিআইজি এবং ১৮ জন অতিরিক্ত আইজি পিআরআই-তে যাবেন। সাধারণত একজন কর্মকর্তা ৫৯ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর পিআরএলে যান।
সূত্রমতে, ২০১২ সালে বাহিনীতে যোগদানকারী ৩০তম বিসিএস ক্যাডার ব্যাচের প্রায় ১৮২ পুলিশ কর্মকর্তা এবং পরের বছর চাকরিতে যোগদানকারী ৩১তম বিসিএস ক্যাডার ব্যাচের ১৮২ জন অতিরিক্ত এসপি থেকে এসপি পদে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন।
পুলিশ সদরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, নিয়মিত প্রক্রিয়ায় এই দুই বিসিএস ক্যাডার ব্যাচের কর্মকর্তাদের উচ্চপদে পদোন্নতি দিতে কমপক্ষে ছয় বছর সময় লাগবে। ২৮তম বিসিএস ব্যাচের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা ১৩ বছর চাকরিতে পূর্ণ করেছি। অন্য সব ক্যাডারে একই বিসিএস ব্যাচের অফিস- অ্যাডমিন, ট্যাক্স, বিদেশি এবং কাস্টমস ইতোমধ্যে উন্নীত করা হয়েছে. উচ্চ পদে উন্নীত না হওয়ায় আমরা হীনমন্যতায় ভুগছি। পুলিশ সদরের প্রস্তাবনা অনুযায়ী সিটু এসপি পদে ৫৫০টি তৈরি করতে সরকারকে বছরে ১.০৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে।
পুলিশ বাহিনীতে বর্তমানে ৩ হাজার ১২৪ জন প্রথম শ্রেণির বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১,২২২ জন এএসপিএস, ১,০০১ অতিরিক্ত এসপিএস, ৫৯৩ এসপি, ২০০ অতিরিক্ত ডিআইজি, ৮৫ ডিআইজি, ২০ অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (গ্রেড ওও), দুই অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (গ্রেড ১) এবং একজন মহাপরিদর্শক।
সূত্রমতে, ৮৫টি এসপি, ৩৯টি অতিরিক্ত ডিআইজি, ১২টি ডিআইজি এবং চারটি অতিরিক্ত আইজির নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাবটি এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। খুব দ্রতই এই পদোন্নতি দেয়ার পর ৫৫০ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে সরকারের নিতীনির্ধারণীদের দেয়া তথ্যমতে, এসব কর্মকর্তাদের খুশি রাখতে সরকার দ্রুতই তাদের পদোন্নতির বিষয়টি ভেবে দেখছেন।
এদিকে, দেশের ৬৪ জেলার এসপি ও ৮টি বিভাগের ডিআইজি ও সব মেট্রোপলিটন এলাকায় দায়িত্বরত ঊর্ধ্বতনদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেয়া হয়েছে। এরমধ্যে অন্তত ১৭টি জেলার পুলিশ সুপারদের নামের পাশে বিএনপি জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের দ্রুতই সরিয়ে সেখানে নতুন এসপি নিয়োগ দেয়ার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এক্ষেত্রে ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এছাড়া দুটি বিভাগের ডিআইজি পদে রদবদল আসতে পারে। তারা দীর্ঘদিন ধরে একই রেঞ্জে কর্মরত রয়েছেন। সেখানে ২২ ব্যাচের কর্মকর্তাদের দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।








