রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধি: বাড়ির আঙিনায় গ্রামের নারীদের সঙ্গে নিয়ে হস্তশিল্পের কাজ করছে আছিরন নেছা। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে পাটজাত পণ্য তৈরি করে চলেছে এ নারী উদ্যোক্তা। ঝুড়ি, পাপোশ, ম্যাট, ব্যাগ, দোলনা, পুতুল, কলমদানি, খেলনা হরিণসহ অন্যান্য সব জিনিস তৈরি হচ্ছে তার শৈল্পিক হাতের ¯পর্শে। এসব পণ্য যাচ্ছে জাপান, জার্মানি, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে। অথচ এ আছিরন নেছার জীবনের গল্পটা ছিল একেবারে ভিন্ন। নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান পায়রাবন্দের জয়রামপুর গ্রামে থাকে আছিরন। সেই স্থানে জন্মেও বাল্যবিবাহ থেকে মুক্তি মেলেনি আছিরন নেছার। যখন প্রাথমিকের গন্ডি পার হবার কথা নয়, ঠিক সেই বয়সে বিয়ের পিড়িতে বসেছিলেন আছিরন। মাত্র ৯ বছর বয়সে বিবাহ হয়েছিল তার। বইখাতা ছেড়ে স্বামীর সংসারের হাল ধরে তিনি। বছর দুয়েক ঘুরতে না ঘুরতেই কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে কন্যাসন্তান। কিন্তু অভাবের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পেরে সেই ফুটফুটে কন্যাকে সাত বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন তিনি। তখন আছিরনের বয়স ১৮। সেই সময় চোখের পানি নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন আছিরন। সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব। বাল্যবিবাহ ও সংসারের অভাব দমাতে পারেনি অদম্য আছিরন নেছাকে। আছিরন শুধু নিজের দিন বদল করেননি। পায়রাবন্দের জয়রামপুর, খোর্দ মুরাদপুর, তকেয়া, কেশবপুর, জোতষষ্ঠি ও ইসলামপুর গ্রামের নারীদের বিনামূল্যে হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। পাট দিয়ে হস্তশিল্পের কাজ করে নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি স্বাবলম্বী করেছে গ্রামের দেড় শতাধিক নারীকে। তাদের অনেকেই নিজেদের অবস্থান থেকে হস্তশিল্পের সঙ্গে কাজ করছে। অনেকে চাকরিও করছে। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি নানা পণ্য দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে যাচ্ছে বিদেশে। আছিরন নেছার হাত ধরে হস্তশিল্পের কাজ শিখেছে রমেজা বেগম। এক সময় স্বামীহারা সংসারের ধকল গেছে তার উপর দিয়ে। এখন আট বছর ধরে আছিরনের সঙ্গে পাট দিয়ে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী তৈরি করছে তিনি। পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী এ নারী বলেন, সাত বছর আগে তার স্বামী মারা গেছে। দুই ছেলে-মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে তিনি। আছিরন নেছার কাছ থেকে তিনি অনেক কাজ শিখেছে। এরজন্য কোনো টাকা লাগেনি। আছিরনের সঙ্গে কাজ করে তিনি যে টাকা পাচ্ছে, তা দিয়ে ভালোভাবেই তার সংসার চলছে। আছিরন নেছার পরিবারের সদস্যরা বলেন, এক সময় ঠিকভাবে তারা দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতে পারতেন না। এখন থাকা খাওয়ার অভাব দূর হওয়ার পাশাপাশি বসতভিটায় পাকা একটি শোরুম করেছে। বাড়ির সামনে আছিরন তার স্বামী খলিলুর রহমানকে একটি মুদিদোকানও করে দিয়েছে। আছিরন নেছা বলেন, ১৯৯২ সালে স্থানীয় এক দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সুদে চার হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। সেই ঋণের টাকার সুদ বাড়তে বাড়তে এক সময় তা দাঁড়ায় ১০ হাজার। টাকা পরিশোধ করতে না পেরে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে যান আছিরন কিন্তু সেখানেও চাকরি জোটেনি। অবশেষে তার শাশুড়ি জমি বন্ধক রেখে সেই দাদন ব্যবসায়ীকে ঋণের টাকা পরিশোধ করে দেন। এরপর বাড়ি ফিরে আসেন আছিরন নেছা। ১৯৯৪ সালে শাশুড়ির দেওয়া সেলাই মেশিন দিয়ে টুকটাক কাজ শুরু করেন। পরে নিজে ও দুই মেয়েকে নিয়ে পাট দিয়ে হস্তশিল্পের পণ্য তৈরি করতেন। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়া আছিরন হস্তজাত পণ্য বুননের কাজে পারদর্শী হয়ে উঠেন। তার কাজে প্রথম সহায়তা করেন তার দুই মেয়ে কোহিনুর বেগম ও গোলেনুর বেগম। হস্তজাত পণ্য তৈরি দেখে গ্রামের অন্য নারীরাও এগিয়ে আসে। তখন বিনামূল্যে নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজটিও শুরু করেন আছিরন। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে হস্তশিল্প নিয়ে বগুড়ার নুনগোলার একটি বড় মেলায় অংশ নিয়েছিলাম। সেই মেলা থেকে কিছু লাভ হয়। সেই লাভের টাকায় ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। পরে আশা কুটির শিল্প নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। এ প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীর সংখ্যা প্রায় পঞ্চশের কাছাকাছি। পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকায় এখন উৎপাদনও বেড়েছে। রংপুর ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুরসহ বেশকিছু এলাকায়ে মেলার মাধ্যমে তৈরি পণ্য ছড়িয়ে পড়েছে। পায়রাবন্দের রোকেয়া স্মৃতি পাঠাগারের উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, এ গ্রামের নারীদের স্বাবলম্বী করতে আছিরনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। পায়রাবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবার রহমান বলেন, মেয়েদের অবহেলা করা ঠিক নয়। আমাদের আছিরন গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছে। তার হাত ধরে অনেকেই কর্মমুখী।
জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান
জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ...







